বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে যাঁর নাম উচ্চারিত হলেই একাধিক যুগের কথা মনে পড়ে, তিনি কিংবদন্তি অভিনেতা সোহেল রানা। অভিনয়, ব্যক্তিত্ব ও সমাজমনস্ক চরিত্রের মাধ্যমে কয়েক দশক ধরে দর্শকের হৃদয়ে স্থায়ী জায়গা করে নিয়েছেন তিনি। আজ ৭৯ বছর পূর্ণ করে ৮০ বছরে পা রাখলেন এই গুণী শিল্পী।
অভিনয়ের মধ্য দিয়ে সমাজ, বাস্তবতা ও মানুষের জীবনের গল্প পর্দায় জীবন্ত করে তুলেছেন সোহেল রানা। তার সংলাপ, উপস্থিতি ও চরিত্র নির্মাণের দক্ষতা আজও বাংলা সিনেমাপ্রেমীদের স্মৃতিতে অমলিন। জন্মদিন উপলক্ষে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক ফেসবুক পোস্টে তিনি দেশ-বিদেশে অবস্থানরত বন্ধু, শুভানুধ্যায়ী ও ভক্তদের কাছে দোয়া কামনা করেন। মন্তব্যের ঘরজুড়ে ভক্তদের শুভেচ্ছা ও ভালোবাসায় ভরে ওঠে সেই পোস্ট।
মাসুদ পারভেজ নামে জন্ম নেওয়া এই অভিনেতা ১৯৪৭ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় জন্মগ্রহণ করেন। ছাত্রজীবনে তিনি ছিলেন সক্রিয় ও তুখোড় ছাত্রনেতা। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধেও তিনি সক্রিয়ভাবে অংশ নেন। স্বাধীনতার পর দেশের সাংস্কৃতিক পুনর্গঠনের অংশ হিসেবে যুক্ত হন চলচ্চিত্র অঙ্গনে, যেখানে তিনি এক অনন্য অধ্যায়ের সূচনা করেন।
প্রযোজক ও পরিচালক হিসেবে তিনি নিজের প্রকৃত নাম মাসুদ পারভেজ ব্যবহার করলেও, অভিনেতা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন ‘সোহেল রানা’ নামে। চলচ্চিত্রে তার এই নামই পরবর্তীতে হয়ে ওঠে একটি শক্তিশালী ব্র্যান্ড। প্রযোজক হিসেবে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ‘পারভেজ ফিল্মস’, যা বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে।
এই প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান থেকেই চাষী নজরুল ইসলাম পরিচালিত বাংলাদেশের প্রথম মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘ওরা ১১ জন’ নির্মিত হয়। মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র নির্মাণের এই সাহসী উদ্যোগ তাকে আলাদা মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করে। ১৯৭৩ সালে অভিনেতা ও পরিচালক হিসেবে তার আনুষ্ঠানিক চলচ্চিত্রযাত্রা শুরু হয়।
পরবর্তীতে প্রখ্যাত সাহিত্যিক কাজী আনোয়ার হোসেনের সৃষ্ট জনপ্রিয় কাল্পনিক চরিত্রকে কেন্দ্র করে নির্মিত ‘মাসুদ রানা’ চলচ্চিত্রে নায়ক চরিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে তিনি ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেন। এই চরিত্রটি তাকে ঢালিউডের অন্যতম জনপ্রিয় তারকায় পরিণত করে।
দীর্ঘ ক্যারিয়ারে সোহেল রানা উপহার দিয়েছেন অসংখ্য জনপ্রিয় চলচ্চিত্র। ‘লালু ভুলু’, ‘অজান্তে’, ‘সাহসী মানুষ চাই’সহ বহু চলচ্চিত্রে তার অভিনয় দর্শকমহলে ব্যাপক প্রশংসা পেয়েছে। অভিনয় দক্ষতার স্বীকৃতি হিসেবে তিনি দুইবার শ্রেষ্ঠ অভিনেতা এবং একবার শ্রেষ্ঠ পার্শ্বচরিত্রে অভিনেতা হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেন। এছাড়াও তিনি পেয়েছেন আজীবন সম্মাননাসহ অসংখ্য সম্মাননা।
অভিনয়, প্রযোজনা ও মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ—সব মিলিয়ে সোহেল রানা কেবল একজন অভিনেতা নন, বরং বাংলা চলচ্চিত্র ও সংস্কৃতির এক জীবন্ত ইতিহাস। ৮০ বছরে পা রাখলেও তার অবদান ও স্মরণীয় কাজ আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক।