যুক্তরাষ্ট্রে কুখ্যাত যৌন অপরাধী প্রয়াত জেফরি এপস্টেইন–এর নাম ঘিরে নতুন করে আলোচনার ঝড় উঠেছে। নিউ মেক্সিকো অঙ্গরাজ্যে অবস্থিত তার এক সময়ের খামারবাড়ি ‘জোরো র্যাঞ্চ’কে কেন্দ্র করে আবারও তদন্ত শুরুর ঘোষণা দিয়েছে রাজ্য কর্তৃপক্ষ। সাম্প্রতিক সময়ে এপস্টেইন–সংক্রান্ত বিপুল পরিমাণ গোপন নথি প্রকাশ এবং তা ঘিরে চলমান বিতর্কের প্রেক্ষাপটেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। খবর জানিয়েছে আল জাজিরা।
নিউ মেক্সিকোর অ্যাটর্নি জেনারেল রাউল তোরেজ গত বৃহস্পতিবার (১৯ ফেব্রুয়ারি) এক বিবৃতিতে জানান, যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ সম্প্রতি যে নথিগুলো প্রকাশ করেছে, তাতে এমন কিছু নতুন তথ্য উঠে এসেছে যা আগের তদন্ত নতুন করে পর্যালোচনা করার প্রয়োজন তৈরি করেছে। তার ভাষায়, “এই তথ্যগুলো উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।”
গত ৩০ জানুয়ারি এপস্টেইন–সংক্রান্ত ৩৫ লাখের বেশি সরকারি নথি অনলাইনে প্রকাশ করা হয়। এসব নথির বড় একটি অংশ এতদিন সিলগালা অবস্থায় ছিল। নিউ মেক্সিকো কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সেই নথিগুলোর মধ্যে এমন কিছু তথ্য রয়েছে যা ২০১৯ সালে বন্ধ হয়ে যাওয়া তদন্ত পুনরায় শুরুর জন্য যথেষ্ট ভিত্তি দেয়।
উল্লেখ্য, ২০১৯ সালে নিউইয়র্কের ফেডারেল কৌঁসুলিদের অনুরোধে নিউ মেক্সিকোতে এপস্টেইন–সংক্রান্ত তদন্ত বন্ধ করা হয়েছিল। ওই বছরই অপ্রাপ্তবয়স্কদের যৌন পাচারের অভিযোগে এপস্টেইনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তবে বিচার প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার আগেই একই বছরের আগস্টে নিউইয়র্কের একটি কারাগারে তাকে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। সরকারি মেডিকেল প্রতিবেদনে বলা হয়, তিনি আত্মহত্যা করেছিলেন।
এপস্টেইনের মৃত্যুর প্রায় ছয় বছর পর তার ‘জোরো র্যাঞ্চ’ খামারবাড়িতে সম্ভাব্য অবৈধ কর্মকাণ্ড নিয়ে নতুন করে তদন্ত শুরুর ঘোষণাকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। নিউ মেক্সিকো কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এ জন্য চার সদস্যের একটি বিশেষ কমিশন গঠন করা হয়েছে। এই কমিশনের মূল কাজ হবে—স্ট্যানলি শহরের কাছে অবস্থিত ওই র্যাঞ্চে যৌন নির্যাতন, পাচার কিংবা অন্য কোনো অপরাধ সংঘটিত হয়েছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা।
এই ঘোষণার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই আরেকটি আলোচিত ঘটনা সামনে আসে। যুক্তরাজ্যের রাজপরিবারের সাবেক সদস্য প্রিন্স অ্যান্ড্রু গ্রেপ্তার হন। অভিযোগ রয়েছে, তিনি গোপন সরকারি নথি এপস্টেইনের কাছে পাঠিয়েছিলেন। এই ঘটনা এপস্টেইন কেলেঙ্কারিকে আরও আন্তর্জাতিক মাত্রা দিয়েছে।
এপস্টেইন কেলেঙ্কারি যুক্তরাজ্যে উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তা ও রাজপরিবারের সদস্যদের নিয়ে তীব্র সমালোচনা ও পদত্যাগের কারণ হলেও যুক্তরাষ্ট্রে এখনো বড় ধরনের রাজনৈতিক পরিবর্তন দেখা যায়নি। সমালোচকদের অভিযোগ, পুরো বিষয়টি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে এখনো পূর্ণ স্বচ্ছতা আসেনি।
এপস্টেইনের প্রভাবশালী সামাজিক যোগাযোগ ও রাজনৈতিক সংযোগ নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে প্রশ্ন উঠে আসছে। তার সঙ্গে বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প–এর এক সময়ের বন্ধুত্ব ছিল বলে জানা যায়। পাশাপাশি ইসরাইলসহ বিভিন্ন বিদেশি সরকারের সঙ্গে তার যোগাযোগ ছিল বলেও বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সমালোচকদের প্রশ্ন, এসব সম্পর্ক কি তাকে জীবিত অবস্থায় আইনি সুরক্ষা দিয়েছিল?
২০০৮ সালে ফ্লোরিডায় অপ্রাপ্তবয়স্ককে যৌন সেবায় প্রলুব্ধ করার অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হন এপস্টেইন। তবে একটি বিতর্কিত সমঝোতা চুক্তির মাধ্যমে তিনি মাত্র ১৩ মাস কারাভোগ করেন। তার সাবেক বান্ধবী গিসলেইন ম্যাক্সওয়েল বর্তমানে ২০ বছরের কারাদণ্ড ভোগ করছেন।
নিউ মেক্সিকোর আইনপ্রণেতারা এখন প্রশ্ন তুলছেন—২০০৮ সালে দোষ স্বীকার করার পরও কেন এপস্টেইনকে ওই অঙ্গরাজ্যে যৌন অপরাধী হিসেবে নিবন্ধিত করা হয়নি। অ্যাটর্নি জেনারেলের দফতর জানিয়েছে, তারা সম্পাদনাহীন ও পূর্ণাঙ্গ ফেডারেল নথি সংগ্রহের চেষ্টা করছে এবং প্রয়োজনে নতুন প্রমাণ জোগাড় করা হবে।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এপস্টেইন ১৯৯৩ সালে নিউ মেক্সিকোর তৎকালীন ডেমোক্র্যাট গভর্নর ব্রুস কিং–এর কাছ থেকে প্রায় ২ হাজার ৪৮০ বর্গমিটারের ‘জোরো র্যাঞ্চ’ সম্পত্তিটি কিনে নেন। পরে ২০২৩ সালে এই সম্পত্তি বিক্রি করা হয়।
এদিকে রয়টার্স–এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এপস্টেইনের নির্দেশে তার জোরো র্যাঞ্চের বাইরে দুই বিদেশি মেয়ের লাশ পুঁতে ফেলার অভিযোগ সংক্রান্ত তথ্যও প্রকাশিত নথিতে উঠে এসেছে। নিউ মেক্সিকোর বিচার বিভাগ জানিয়েছে, এই গুরুতর অভিযোগ নিয়েও তদন্ত চলছে।
সব মিলিয়ে, এপস্টেইনের ‘জোরো র্যাঞ্চ’ ঘিরে নতুন করে শুরু হওয়া এই তদন্ত শুধু অতীতের একটি অপরাধের খোঁজ নয়, বরং ক্ষমতা, প্রভাব ও ন্যায়বিচার নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরকার বড় প্রশ্নগুলোকে আবারও সামনে এনে দিয়েছে।