অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় চলমান সংঘাতে প্রাণহানির প্রকৃত চিত্র নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। একাধিক স্বাধীন গবেষণায় দাবি করা হয়েছে, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে ২০২৫ সালের শুরু পর্যন্ত ইসরায়েলি সামরিক অভিযানে ৭৫ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। বৃহস্পতিবার (১৯ ফেব্রুয়ারি) Al Jazeera এক প্রতিবেদনে এই তথ্য তুলে ধরে।
বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় চিকিৎসাবিষয়ক সাময়িকীতে প্রকাশিত গবেষণা নিবন্ধগুলোর ধারাবাহিক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনিক নথিতে যে মৃত্যুর সংখ্যা প্রকাশ করা হয়েছিল, তা অতিরঞ্জিত নয়; বরং সেটি ছিল সম্ভাব্য মৃত্যুর একটি নিম্নসীমা। গবেষকেরা মনে করছেন, যুদ্ধের কারণে তথ্য সংগ্রহের অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে।
The Lancet Global Health-এ প্রকাশিত Gaza Mortality Survey (GMS)-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে ২০২৫ সালের ৫ জানুয়ারি পর্যন্ত ৭৫ হাজার ২০০ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। যুদ্ধের আগে গাজার জনসংখ্যা ছিল আনুমানিক ২২ লাখ। সেই হিসাবে নিহতের হার দাঁড়ায় প্রায় ৩ দশমিক ৪ শতাংশ। একই সময়ের জন্য গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ৪৯ হাজার ৯০টি সহিংস মৃত্যুর তথ্য দিয়েছিল, যা নতুন জরিপের তুলনায় প্রায় ৩৪ দশমিক ৭ শতাংশ কম।
গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ হিসাবে চলতি বছরের ২৭ জানুয়ারি পর্যন্ত নিহতের সংখ্যা ৭১ হাজার ৬৬২। ২০২৫ সালের ১০ অক্টোবর যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পরও ৪৮৮ জনের মৃত্যুর তথ্য জানানো হয়। ইসরায়েল দীর্ঘদিন ধরে এসব সংখ্যাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে আসছে। তবে জানুয়ারিতে দেশটির এক সামরিক কর্মকর্তা সাংবাদিকদের জানান, যুদ্ধে গাজায় প্রায় ৭০ হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন।
নতুন গবেষণায় দেখা গেছে, নিহতদের মধ্যে ৫৬ দশমিক ২ শতাংশ নারী, শিশু ও বয়স্ক। জরিপের অংশ হিসেবে ২ হাজার পরিবারের সাক্ষাৎকার নেওয়া হয় এবং এতে ৯ হাজার ৭২৯ জনের তথ্য অন্তর্ভুক্ত করা হয়। গবেষকেরা বলছেন, সরাসরি পরিবারভিত্তিক তথ্য সংগ্রহের এই পদ্ধতি মৃত্যুর পরিসংখ্যান নির্ধারণে একটি প্রমাণভিত্তিক ভিত্তি তৈরি করেছে।
গবেষণার প্রধান লেখক, Royal Holloway, University of London-এর অর্থনীতির অধ্যাপক মিশেল স্প্যাগাট মন্তব্য করেন, গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদন সাধারণভাবে নির্ভরযোগ্য। তবে যুদ্ধের কারণে তথ্য সংরক্ষণ ও যাচাইয়ের কাঠামো ভেঙে পড়ায় প্রকৃত সংখ্যা নথিভুক্ত করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
উল্লেখযোগ্য যে, ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে The Lancet-এ প্রকাশিত আগের এক গবেষণায় ‘capture-recapture’ নামের পরিসংখ্যানভিত্তিক মডেল ব্যবহার করে যুদ্ধের প্রথম নয় মাসে ৬৪ হাজার ২৬০ জনের মৃত্যুর হিসাব দেওয়া হয়েছিল। সেই গবেষণা সম্ভাব্য কম গণনার বিষয়টি ইঙ্গিত করেছিল। নতুন জরিপটি গাণিতিক অনুমানের বাইরে গিয়ে সরাসরি সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে তথ্য যাচাই করেছে এবং সময়সীমা বাড়িয়ে ২০২৫ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত অন্তর্ভুক্ত করেছে।
২০২৫ সালের শেষ দিকে গাজার ৮০ শতাংশের বেশি এলাকা জোরপূর্বক খালি করতে বাধ্য করা হয়। উত্তর গাজা ও রাফাহ প্রায় সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস হয়ে যায়। একই বছরের আগস্টে উত্তর গাজায় দুর্ভিক্ষ ঘোষণা করা হয়, যা আহত ও বাস্তুচ্যুত মানুষের বেঁচে থাকার সম্ভাবনাকে আরও কমিয়ে দেয়।
গবেষকেরা বলছেন, এই ফলাফল তাৎক্ষণিক যুদ্ধবিরতি এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে। আন্তর্জাতিক মানবিক আইনে সুরক্ষিত স্বাস্থ্য অবকাঠামো বারবার হামলার শিকার হওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে। তাদের মতে, এই ধারা অব্যাহত থাকলে গাজায় মানবিক বিপর্যয় আরও গভীর হবে।
সর্বশেষ গবেষণাগুলো গাজায় প্রাণহানির পরিসর বোঝার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি তৈরি করেছে। একই সঙ্গে এটি সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে তথ্যসংগ্রহের সীমাবদ্ধতা ও বাস্তবতার জটিলতাও সামনে নিয়ে এসেছে।