এক অভিযোগে কেউ গুম এক মাস, কেউ সাত বছর—উদ্দেশ্য ছিল দমন The Daily Cosmic Post
ঢাকা | বঙ্গাব্দ
ঢাকা |

এক অভিযোগে কেউ গুম এক মাস, কেউ সাত বছর—উদ্দেশ্য ছিল দমন

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Jan 15, 2026 ইং
এক অভিযোগে কেউ গুম এক মাস, কেউ সাত বছর—উদ্দেশ্য ছিল দমন ছবির ক্যাপশন:
ad728

জোরপূর্বক গুমের শিকার ব্যক্তিদের কেউ নিখোঁজ ছিলেন মাত্র এক দিন, আবার কেউ সাত বছরেরও বেশি সময়। গুমবিষয়ক কমিশনের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এই চরম তারতম্য প্রমাণ করে যে গুম কোনো আইনি বা কার্যকর তদন্ত প্রক্রিয়ার অংশ ছিল না; বরং এটি ভয়ভিত্তিক শাসন প্রতিষ্ঠার একটি কার্যকর অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।

কমিশনের প্রতিবেদনে ২৫৬টি ঘটনার নমুনা বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, গুমের মধ্যম সময়কাল ছিল ৪৫ দিন। অর্থাৎ অর্ধেক ভুক্তভোগীকে এর চেয়ে কম সময় এবং বাকি অর্ধেককে এর চেয়ে বেশি সময় নিখোঁজ রাখা হয়েছিল। তবে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ব্যক্তি কয়েক মাস থেকে কয়েক বছর পর্যন্ত নিখোঁজ ছিলেন। কিছু ব্যতিক্রমী ঘটনায় গুমের সময়কাল দুই হাজার ৯০০ দিনেরও বেশি ছাড়িয়েছে।

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি গুমের সময়কাল কোনো আইনি যুক্তি বা তদন্তের ধারা অনুসরণ করত, তাহলে স্বল্প ঝুঁকির মামলায় স্বল্পমেয়াদি এবং গুরুতর অভিযোগে দীর্ঘমেয়াদি আটক—এমন একটি স্পষ্ট কাঠামো দেখা যেত। বাস্তবে দেখা গেছে, একই ধরনের অভিযোগে কাউকে কয়েক দিন, আবার কাউকে বছরের পর বছর গুম করে রাখা হয়েছে। এই অসংগতি গুমকে একটি পরিকল্পিত দমন কাঠামোর অংশ হিসেবে স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করে।

গুমের শিকারদের মধ্যে ছাত্র, ব্যবসায়ী, রাজনৈতিক কর্মী ও সাধারণ মানুষ ছিলেন। কেউ অপহৃত হয়েছেন ২০১২ সালে, কেউ এক দশক পর। সময় ও পেশা ভিন্ন হলেও অভিযোগে ছিল অভিন্নতা। কমিশনের মতে, ভিন্নমত, প্রতিবাদ বা আদর্শিক অবস্থানকে একটি পূর্বনির্ধারিত ‘জাতীয় হুমকি’র বয়ানে ফেলে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অভিযোগপত্রে প্রায়ই অস্পষ্ট ভাষা, পুনর্ব্যবহৃত অভিযোগ এবং সূত্রগত ন্যায্যতার আশ্রয় নেওয়া হয়েছে, যা প্রকৃত প্রমাণ যাচাই-বাছাইকে এড়িয়ে গেছে।

অনেক ক্ষেত্রে গুম শেষে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী প্রেস ব্রিফিংয়ের মাধ্যমে ভুক্তভোগীদের গণমাধ্যমের সামনে হাজির করেছে। আনুষ্ঠানিক অভিযোগ বা আদালতের শুনানির আগেই তাদের ‘সন্ত্রাসী’ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।

কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, জীবিত ফিরে আসা গুমের শিকারদের অধিকাংশের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা দেওয়া হয়েছে। ২৫৬ জনের মধ্যে ১৯৫ জনের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবিরোধী আইন, ৫১ জনের বিরুদ্ধে বিস্ফোরক দ্রব্য আইন, ৪২ জনের বিরুদ্ধে অস্ত্র আইন, ৯ জনের বিরুদ্ধে বিশেষ ক্ষমতা আইন এবং ৭ জনের বিরুদ্ধে ডিজিটাল সিকিউরিটি আইনে মামলা করা হয়েছে। অনেকের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা দায়ের করা হয়েছে।

২০১৭ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত সন্ত্রাসবিরোধী ট্রাইব্যুনালের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, নিষ্পত্তি হওয়া মামলার মাত্র ৭ শতাংশে দণ্ডাদেশ হয়েছে। ৭৯৪টি মামলার মধ্যে মাত্র ৫২টিতে দোষী সাব্যস্ত হয়েছে, বাকি ৯৩ শতাংশ আসামি খালাস পেয়েছেন। তবু বছরের পর বছর মামলা চলায় ভুক্তভোগীদের নিয়মিত আদালতে হাজিরা দিতে হয়েছে, কখনো এক জেলা থেকে আরেক জেলায় ছুটতে হয়েছে।

গুমের শিকার ব্যক্তিদের পরিবারগুলোকে বহন করতে হয়েছে গুরুতর আর্থিক চাপ। আইনি লড়াই চালাতে গিয়ে পরিবারগুলোর গড় ব্যয় দাঁড়িয়েছে প্রায় সাত লাখ টাকা। এই ব্যয়ের মধ্যে রয়েছে আইনজীবীর ফি, আদালতে যাতায়াত, জামিন ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক খরচ। অর্ধেকের বেশি পরিবারকে সাত লাখ টাকারও বেশি ব্যয় করতে হয়েছে, যা বাংলাদেশের গড় পরিবারের দুই বছরের বেশি আয়ের সমান।

মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, গুমের পর দীর্ঘ আইনি হয়রানি কোনো বিচারিক ব্যর্থতা নয়, বরং একটি পরিকল্পিত দমন কৌশল। এক মানবাধিকারকর্মীর ভাষায়, “মানুষকে বলা হয়, শেষ পর্যন্ত বেঁচে ফিরবে। কিন্তু মিডিয়ায় দেখানো হবে, মামলা হবে, জেলে থাকতে হবে। এই প্রক্রিয়াটাই আসলে শাস্তি।”

একটি কিশোরের ঘটনা এই বাস্তবতাকে আরও নির্মমভাবে তুলে ধরে। নবম শ্রেণিতে ওঠার আগেই গুম হওয়া ওই কিশোর দুই বছর গোপন বন্দিশালায় এবং পরে আরও দুই বছর কারাগারে কাটায়। মুক্তির পরও তার মানসিক বিপর্যয় কাটেনি। দরিদ্র পরিবারটি চিকিৎসা ও মামলার খরচ মেটাতে সম্পূর্ণ নিঃস্ব হয়ে পড়ে।


নিউজটি পোস্ট করেছেন : কসমিক ডেস্ক

কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ
বয়স বাড়লে বদলায় শরীরের পুষ্টির চাহিদা

বয়স বাড়লে বদলায় শরীরের পুষ্টির চাহিদা