
জোরপূর্বক গুমের শিকার ব্যক্তিদের কেউ নিখোঁজ ছিলেন মাত্র এক দিন, আবার কেউ সাত বছরেরও বেশি সময়। গুমবিষয়ক কমিশনের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এই চরম তারতম্য প্রমাণ করে যে গুম কোনো আইনি বা কার্যকর তদন্ত প্রক্রিয়ার অংশ ছিল না; বরং এটি ভয়ভিত্তিক শাসন প্রতিষ্ঠার একটি কার্যকর অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।
কমিশনের প্রতিবেদনে ২৫৬টি ঘটনার নমুনা বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, গুমের মধ্যম সময়কাল ছিল ৪৫ দিন। অর্থাৎ অর্ধেক ভুক্তভোগীকে এর চেয়ে কম সময় এবং বাকি অর্ধেককে এর চেয়ে বেশি সময় নিখোঁজ রাখা হয়েছিল। তবে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ব্যক্তি কয়েক মাস থেকে কয়েক বছর পর্যন্ত নিখোঁজ ছিলেন। কিছু ব্যতিক্রমী ঘটনায় গুমের সময়কাল দুই হাজার ৯০০ দিনেরও বেশি ছাড়িয়েছে।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি গুমের সময়কাল কোনো আইনি যুক্তি বা তদন্তের ধারা অনুসরণ করত, তাহলে স্বল্প ঝুঁকির মামলায় স্বল্পমেয়াদি এবং গুরুতর অভিযোগে দীর্ঘমেয়াদি আটক—এমন একটি স্পষ্ট কাঠামো দেখা যেত। বাস্তবে দেখা গেছে, একই ধরনের অভিযোগে কাউকে কয়েক দিন, আবার কাউকে বছরের পর বছর গুম করে রাখা হয়েছে। এই অসংগতি গুমকে একটি পরিকল্পিত দমন কাঠামোর অংশ হিসেবে স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করে।
আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অভিযোগপত্রে প্রায়ই অস্পষ্ট ভাষা, পুনর্ব্যবহৃত অভিযোগ এবং সূত্রগত ন্যায্যতার আশ্রয় নেওয়া হয়েছে, যা প্রকৃত প্রমাণ যাচাই-বাছাইকে এড়িয়ে গেছে।
কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, জীবিত ফিরে আসা গুমের শিকারদের অধিকাংশের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা দেওয়া হয়েছে। ২৫৬ জনের মধ্যে ১৯৫ জনের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবিরোধী আইন, ৫১ জনের বিরুদ্ধে বিস্ফোরক দ্রব্য আইন, ৪২ জনের বিরুদ্ধে অস্ত্র আইন, ৯ জনের বিরুদ্ধে বিশেষ ক্ষমতা আইন এবং ৭ জনের বিরুদ্ধে ডিজিটাল সিকিউরিটি আইনে মামলা করা হয়েছে। অনেকের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা দায়ের করা হয়েছে।
একটি কিশোরের ঘটনা এই বাস্তবতাকে আরও নির্মমভাবে তুলে ধরে। নবম শ্রেণিতে ওঠার আগেই গুম হওয়া ওই কিশোর দুই বছর গোপন বন্দিশালায় এবং পরে আরও দুই বছর কারাগারে কাটায়। মুক্তির পরও তার মানসিক বিপর্যয় কাটেনি। দরিদ্র পরিবারটি চিকিৎসা ও মামলার খরচ মেটাতে সম্পূর্ণ নিঃস্ব হয়ে পড়ে।