বর্ষার ভরা মৌসুমের প্রায় দুই মাস পেরিয়ে গেলেও দেশের বাজারে ইলিশের সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কম। যেটুকু ইলিশ পাওয়া যাচ্ছে, তার বড় অংশই ছোট আকারের এবং দামও সাধারণ ক্রেতাদের নাগালের বাইরে। মৎস্য বিভাগের তথ্য ও সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য অনুযায়ী, নদীতে নাব্যতা সংকট, দূষণ, প্রজনন পরিবেশের অবনতি এবং নির্বিচারে জাটকা ও মা-ইলিশ ধরার কারণে কয়েক বছর ধরে ইলিশের উৎপাদন কমছে।
তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে দেশে ইলিশ আহরণ হয়েছিল ৫ দশমিক ৩২ লাখ টন। ২০১৯-২০ অর্থবছরে তা বেড়ে ৫ দশমিক ৫০ লাখ টন এবং ২০২০-২১ সালে ৫ দশমিক ৬৫ লাখ টনে পৌঁছায়। ২০২১-২২ সালে উৎপাদন ছিল ৫ দশমিক ৬৬ লাখ এবং ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৫ দশমিক ৭১ লাখ টন। এরপর উৎপাদনে পতন শুরু হয়ে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৫ লাখ ২৯ হাজার ৪৮৭ টনে নেমে আসে। সর্বশেষ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে উৎপাদন প্রায় পাঁচ লাখ টনে দাঁড়িয়েছে।
ছোট হচ্ছে ইলিশের আকার
ইলিশের উৎপাদনের পাশাপাশি মাছটির গড় আকারও কমেছে। ইলিশ গবেষক ও বাংলাদেশ মৎস্য বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক আনিসুর রহমানের মতে, একসময় ইলিশের গড় ওজন ৪০০ থেকে ৪৫০ গ্রাম থাকলেও বর্তমানে তা ৩০০ থেকে ৩৫০ গ্রামে নেমেছে। জলবায়ু পরিবর্তনে সমুদ্রের তাপমাত্রা বৃদ্ধি, নদীদূষণ, নাব্যতা সংকট এবং প্রজননের স্বাভাবিক পরিবেশ ব্যাহত হওয়ার প্রভাবও ইলিশের ওপর পড়ছে বলে জানান তিনি।
খুলনা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. বদরুজ্জামান বলেন, একটি ইলিশ এক থেকে দেড় কেজি ওজনের হতে অন্তত দেড় বছর সময় লাগে। অতিরিক্ত মাছ ধরা, মোহনায় নিষিদ্ধ জালের ব্যবহার, বালু উত্তোলন, শিল্পদূষণ ও অপরিকল্পিত অবকাঠামোর কারণে ইলিশের স্বাভাবিক জীবনচক্র ব্যাহত হচ্ছে।
চড়া দামে বিপাকে ক্রেতা
বর্তমানে বাজারে ৩০০ থেকে ৪০০ গ্রাম ওজনের ইলিশ ১ হাজার ৪০০ থেকে ১ হাজার ৬০০ টাকা, এক কেজি প্রায় ৩ হাজার ৫০০ টাকা এবং দেড় কেজি পর্যন্ত ইলিশ ৪ হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ব্যবসায়ীরা সরবরাহব্যবস্থার বিভিন্ন ধাপে হাতবদল, দাদন, বরফ ও জ্বালানি খরচ বৃদ্ধিকে দাম বাড়ার কারণ হিসেবে উল্লেখ করছেন।
সরবরাহ সংকটের প্রভাব পড়েছে মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রগুলোতেও। বিএফডিসির আওতাধীন ২০টি কেন্দ্রের মধ্যে পাঁচটি বন্ধ এবং নয়টি সীমিত পরিসরে চলছে। খুলনা মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রে চলতি জুলাই পর্যন্ত মাত্র দেড় হাজার কেজি ইলিশ এসেছে, যেখানে ২০২২ সালের জুলাইয়ে এসেছিল ৩৮ হাজার ৫৪৬ কেজি।
বিশেষজ্ঞরা জাটকা ও মা-ইলিশ ধরা বন্ধ, নিষিদ্ধ ট্রলিং নিয়ন্ত্রণ, নদীর সমন্বিত ব্যবস্থাপনা, অভয়াশ্রম কার্যকরভাবে সংরক্ষণ এবং সংশ্লিষ্ট আইন বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।
কসমিক ডেস্ক