দেশের ইতিহাসে প্রায় প্রতিটি জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করেই রাজনৈতিক অস্থিরতার চিত্র দেখা গেছে। এর ব্যতিক্রম হচ্ছে না এবারের নির্বাচনও। নির্বাচন সামনে রেখে রাজনৈতিক কর্মসূচি, পাল্টাপাল্টি আন্দোলন ও সহিংসতার আশঙ্কায় দেশের ব্যবসায়ী ও শিল্পোদ্যোক্তারা নতুন করে উৎকণ্ঠায় পড়েছেন। এরই মধ্যে বিনিয়োগ স্থবিরতা এবং অর্থনৈতিক সূচকের নিম্নমুখী প্রবণতা পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে।
রাজনৈতিক অস্থিরতার সরাসরি প্রভাব পড়ছে ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্পখাতে। নির্বাচন ঘিরে কয়েকটি রাজনৈতিক দলের যুগপৎ আন্দোলনের ঘোষণা এবং নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের বিভিন্ন কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে সহিংসতার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এতে উৎপাদন, সরবরাহ ব্যবস্থা ও বিনিয়োগ পরিকল্পনা ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, নির্বাচনকালীন অস্থিরতায় বিদেশি ক্রেতাদের মধ্যেও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। তাঁর ভাষায়, “অনেক বায়ার এখন বাংলাদেশে আসা স্থগিত রেখেছে। কেউ কেউ বলছে, আগে রাজনৈতিক পরিস্থিতি স্থিতিশীল হোক, নির্বাচন শেষ হোক—তারপর তারা নতুন অর্ডার বা বিনিয়োগের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে।”
তিনি আরও বলেন, সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীরাও অপেক্ষার নীতিতে রয়েছেন। রাজনৈতিক পরিস্থিতি কোন দিকে যায়, তা দেখে তারপর তারা সিদ্ধান্ত নিতে চান।
অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. মো. শাহাদাত হোসেন সিদ্দিকী বলেন, দেশের অর্থনীতি ইতিমধ্যে প্রত্যাশিত প্রবৃদ্ধি অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা থাকলে প্রবৃদ্ধির চিত্র ভিন্ন হতে পারত। তিনি বলেন, “আমাদের প্রবৃদ্ধি রেকর্ড নিম্নমুখী হয়েছে। বৈদেশিক ও অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি এমন যে, অগ্রগতি পেতে হলে আমাদের ১৮–২০ বছর পেছনে তাকাতে হয়।”
বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার পাশাপাশি অর্থায়ন সংকট, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং রাজস্ব আদায়ের ধীরগতি—সব মিলিয়ে দেশের অর্থনীতি এখন বহুমুখী চাপের মুখে। সম্ভাবনাময় অনেক শিল্প-কারখানা অর্থের অভাবে ঘুরে দাঁড়াতে পারছে না। আবার বড় ও প্রতিষ্ঠিত অনেক প্রতিষ্ঠানও নতুন বিনিয়োগে আগ্রহ হারাচ্ছে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, রাজনৈতিক রূপান্তর দীর্ঘায়িত হলে অনিশ্চয়তা বাড়ে। তাঁর মতে, জনগণ নির্বাচিত রাজনৈতিক নেতৃত্বের মাধ্যমেই দেশ পরিচালনা দেখতে চায়। অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদ দ্রুত শেষ করে নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন নেতৃত্বের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করাই এখন জনগণের প্রত্যাশা।
বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও শান্তিপূর্ণ সমাধান না এলে অর্থনীতির ওপর চাপ আরও বাড়বে। এতে কর্মসংস্থান, শিল্প উৎপাদন ও রপ্তানি খাতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, নির্বাচনকেন্দ্রিক সহিংসতা ও রাজনৈতিক অচলাবস্থা দেশের অর্থনীতিকে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে ফেলেছে। এবারও যদি সেই ধারাবাহিকতা বজায় থাকে, তবে এর প্রভাব দীর্ঘমেয়াদে ব্যবসা ও শিল্পখাতকে আরও দুর্বল করে দিতে পারে।
কসমিক ডেস্ক