ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে গুমের মাধ্যমে মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন ঘটানো হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে দীর্ঘদিন ধরেই। গুমের শিকার অনেককে পরবর্তীতে হত্যা করা হয় এবং আজও শত শত পরিবার তাদের স্বজনের সন্ধান পায়নি। গুমের শিকার পরিবারগুলোর সংগঠন ‘মায়ের ডাক’–এর তথ্য অনুযায়ী, আওয়ামী লীগ আমলে গুম হওয়া ৭০৫ জনের মধ্যে এখনো ৩৫০ জনের কোনো খোঁজ মেলেনি।
গুমের এই বর্বরতা শুধু দেশীয় পর্যায়ে নয়, আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও তীব্র সমালোচনার জন্ম দেয়। জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা এ বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে এবং নিষেধাজ্ঞাও আরোপ করে।
র্যাব ও গোয়েন্দা সংস্থার ভূমিকা
গুমসংক্রান্ত কমিশনের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, গুমের ঘটনায় সবচেয়ে বেশি সম্পৃক্ত ছিল র্যাব। কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, মোট গুমের প্রায় ২৫ শতাংশ ঘটেছে র্যাবের মাধ্যমে। এরপর রয়েছে পুলিশ (২৩ শতাংশ)। এছাড়া ডিবি, সিটিটিসি, ডিজিএফআই ও এনএসআই–এর বিরুদ্ধেও ব্যাপক হারে গুমে জড়িত থাকার অভিযোগ পাওয়া গেছে।
কমিশনের তদন্তে দেশের বিভিন্ন স্থানে ৪০টি গোপন বন্দিশালার সন্ধান মিলেছে। এর মধ্যে র্যাবের নিয়ন্ত্রণে ছিল ২২ থেকে ২৩টি। কমিশনের কাজ শুরু হওয়ার পর সবচেয়ে বেশি আলামত ধ্বংসের অভিযোগও উঠেছে র্যাবের বিরুদ্ধে।
এই বাস্তবতায় কমিশন র্যাব বিলুপ্তিসহ ব্যাপক প্রাতিষ্ঠানিক ও আইনগত সংস্কারের সুপারিশ করে।
বিলুপ্তি নয়, সংস্কারের পক্ষে মত
তবে দেশের বিশিষ্টজনরা র্যাব বিলুপ্তির পরিবর্তে গভীর সংস্কারের পক্ষে মত দিয়েছেন। সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আশরাফুল হুদা বলেন,
“র্যাব বাতিল করে দিলেই সমস্যার সমাধান হবে না। কেন এবং কারা র্যাবকে এই অবস্থায় নিয়ে গেল—তা খুঁজে বের করে দায়ীদের শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।”
তার মতে, র্যাব গঠনের সময় সন্ত্রাস দমনে বাহিনীটি কার্যকর ভূমিকা রেখেছিল। পরবর্তীতে কিছু কর্মকর্তার অপকর্মে পুরো বাহিনী প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে।
সাবেক আইজিপি আব্দুল কাইয়ুম বলেন,
“বিএনপি আমলে র্যাব গঠনের উদ্দেশ্য ভালো ছিল এবং সাধারণ মানুষ সন্তুষ্ট ছিল। কিন্তু আওয়ামী লীগ আমলে র্যাব রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ দমন ও গুম-খুনে ব্যবহৃত হয়েছে। এজন্য সংস্কার প্রয়োজন।”
জবাবদিহির ওপর জোর বিশেষজ্ঞদের
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বলেন,
“গুমের দায় এড়িয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। প্রতিষ্ঠান নয়, ব্যক্তি অপরাধী—এই জায়গা থেকে সংস্কার করতে হবে।”
তিনি বলেন, রাজনৈতিক তুষ্টি, পদোন্নতি ও ক্ষমতার সুবিধা পেতে অনেক কর্মকর্তা নিজেরাই সরকারকে অধিকারবহির্ভূত পরামর্শ দিয়েছেন। তাই ভবিষ্যতে গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে কঠোর জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।
সামরিকীকরণ নিয়ে উদ্বেগ
জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ড. শাহদীন মালিক মনে করেন, বিশেষ কাজের জন্য র্যাব থাকতে পারে, তবে সেখানে সামরিক বাহিনীর সদস্যদের ধাপে ধাপে বাদ দেওয়া জরুরি।
“আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার সামরিকীকরণ দীর্ঘমেয়াদে আইনের শাসন ও গণতন্ত্রের জন্য ক্ষতিকর।”
তার মতে, যেসব দেশে গণতন্ত্র দুর্বল, সেসব দেশেই আইনশৃঙ্খলাকে অতিমাত্রায় সামরিকীকরণ করা হয়—যা বাংলাদেশের দুর্বল গণতান্ত্রিক কাঠামোর প্রতিফলন।
উপসংহার
বিশ্লেষকদের মতে, গুমের মতো মানবতাবিরোধী অপরাধ বন্ধ করতে হলে শুধু অতীতের দায় স্বীকার নয়—গোয়েন্দা সংস্থা ও র্যাবকে কার্যকর জবাবদিহি, আইনগত সংস্কার এবং অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনাই একমাত্র পথ। অন্যথায় একই অপব্যবহার ভিন্ন সরকার আমলেও পুনরাবৃত্তি হওয়ার আশঙ্কা থেকে যাবে।