ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনির শেষকৃত্যকে ঘিরে রাজধানী তেহরানে সৃষ্টি হয়েছে গভীর শোকের আবহ। দেশ-বিদেশ থেকে হাজারো মানুষ তাঁর প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানাতে জড়ো হচ্ছেন। এই শোকানুষ্ঠানে অংশ নিতে যুক্তরাজ্য থেকে প্রায় ৪ হাজার কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে দেশে ফিরেছেন মাজিয়া নামে এক ইরানি নারী। তাঁর ভাষায়, এই ঐতিহাসিক মুহূর্তে নিজের দেশের পাশে দাঁড়ানোই ছিল তাঁর একমাত্র উদ্দেশ্য।
তেহরানের গ্র্যান্ড মোসাল্লার পথে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে মাজিয়া বলেন, তিনি বিশ্বের কাছে একটি বার্তা পৌঁছে দিতে চান—হাজার বছরের ঐতিহ্য ও সভ্যতা নিয়ে গড়ে ওঠা ইরানকে কোনো শক্তিই ধ্বংস করতে পারবে না। তাঁর মতে, ইরানের বিরুদ্ধে যে কোনো ধরনের আগ্রাসন শেষ পর্যন্ত সেই আগ্রাসনকারীর জন্যই ক্ষতিকর হয়ে দাঁড়াবে।
মাজিয়ার বক্তব্যে সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক উত্তেজনারও প্রতিফলন দেখা যায়। তিনি বলেন, সাম্প্রতিক সংঘাত ইরানের জনগণকে দুর্বল না করে বরং আরও ঐক্যবদ্ধ করেছে। তাঁর দাবি, বিদেশি চাপ ও সামরিক সংঘাত দেশটির মানুষের জাতীয় চেতনা এবং সংকল্পকে আরও দৃঢ় করেছে। একই সঙ্গে তিনি পশ্চিমা দেশগুলোর হস্তক্ষেপমূলক নীতিরও সমালোচনা করেন এবং অন্য দেশের সম্পদ ও সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের আহ্বান জানান।
তিনি আরও বলেন, বিভিন্ন দেশে সামরিক অভিযান ও সংঘাতের প্রভাব সাধারণ মানুষের জীবনকে বিপর্যস্ত করে তুলছে। এ কারণে তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি শান্তিপূর্ণ সমাধানের পথ খোঁজার আহ্বান জানান। তাঁর মতে, যুদ্ধ কখনো স্থায়ী সমাধান বয়ে আনে না; বরং দীর্ঘমেয়াদে মানবিক সংকট আরও বাড়িয়ে তোলে।
এদিকে তেহরানের গ্র্যান্ড মোসাল্লায় দিনভর মানুষের ঢল অব্যাহত রয়েছে। জাতীয় পতাকা, কালো শোকের ব্যানার এবং ধর্মীয় প্রতীকে সজ্জিত রাজধানীর প্রধান সড়কগুলোতে লাখো মানুষ শোক প্রকাশ করছেন। স্বেচ্ছাসেবকেরা জনসমাগম নিয়ন্ত্রণ এবং শোকযাত্রীদের সহায়তায় কাজ করছেন। আয়োজকদের ধারণা, পুরো শোকযাত্রায় অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা কয়েক মিলিয়নে পৌঁছাতে পারে।
শোকানুষ্ঠানে অংশ নেওয়া অনেকেই সাম্প্রতিক সংঘাতে নিহত সাধারণ মানুষের স্মৃতিও স্মরণ করছেন। রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে যুদ্ধের ভয়াবহতা তুলে ধরে নিহত শিশুদের ছবি সম্বলিত পোস্টার টাঙানো হয়েছে। এসব ছবি মানুষের আবেগকে আরও নাড়া দিচ্ছে এবং সাম্প্রতিক সংঘাতের ক্ষতকে নতুন করে সামনে এনে দিচ্ছে।
খামেনির কফিনের পাশে তাঁর পরিবারের একটি ছবি রাখা হয়েছে, যা অনেক শোকাহত মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। বিশেষ করে তাঁর কনিষ্ঠ নাতি-নাতনিদের ছবির সামনে দাঁড়িয়ে অনেকে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়ছেন। পুরো অনুষ্ঠানজুড়ে ধর্মীয় শোকগীতি, দোয়া ও নীরব শ্রদ্ধা নিবেদনের মধ্য দিয়ে পরিবেশ আরও গম্ভীর হয়ে উঠেছে।
আয়োজকদের পরিকল্পনা অনুযায়ী, তেহরানে আনুষ্ঠানিক শোকানুষ্ঠান শেষে খামেনির মরদেহ কুম শহরে নেওয়া হবে। এরপর ইরাকের পবিত্র শহর নাজাফ ও কারবালায় নিয়ে যাওয়া হবে এবং সবশেষে উত্তর-পূর্ব ইরানের মাশহাদ শহরে দাফন সম্পন্ন হবে। এই দীর্ঘ শেষযাত্রাকে ঘিরে নিরাপত্তা ব্যবস্থাও জোরদার করা হয়েছে।
পর্যবেক্ষকদের মতে, শোকানুষ্ঠান শুধু একটি রাষ্ট্রীয় আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি ইরানের বর্তমান রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতিরও প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছে। রাজধানীজুড়ে মানুষের ব্যাপক উপস্থিতি, ধর্মীয় আবেগ এবং জাতীয় ঐক্যের বার্তা দেশটির বর্তমান বাস্তবতাকে নতুনভাবে তুলে ধরছে। একই সঙ্গে সাম্প্রতিক সংঘাতের স্মৃতি এবং যুদ্ধের মানবিক প্রভাবও এই আয়োজনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।
খামেনির শেষকৃত্যকে কেন্দ্র করে তেহরানজুড়ে যে শোক ও আবেগের পরিবেশ তৈরি হয়েছে, তা শুধু ইরানের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতিই নয়, আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিদেশে বসবাসকারী অনেক ইরানিও এই অনুষ্ঠানে অংশ নিতে দেশে ফিরেছেন, যা তাঁদের জাতীয় পরিচয় ও আবেগের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
কসমিক ডেস্ক