চীনের জনপ্রিয় টিভি উপস্থাপক ও অভিনেত্রী শি না (Xie Na) দেশব্যাপী কনসার্ট সফর শুরু করার ঘোষণা দেওয়ার পর ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেন। তবে সেই উচ্ছ্বাস বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। গানের দক্ষতা নিয়ে তীব্র সমালোচনা, অনলাইন বিতর্ক এবং জনমতের চাপের মধ্যে সফরের প্রথম বেইজিং কনসার্ট বাতিল করা হয়েছে।
দীর্ঘদিন ধরে চীনের জনপ্রিয় ভ্যারাইটি অনুষ্ঠান Happy Camp-এর অন্যতম পরিচিত মুখ হিসেবে দর্শকদের কাছে জনপ্রিয় শি না অভিনয় ও উপস্থাপনায় সফল হলেও সংগীতজীবনে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার স্বপ্ন অনেক দিনের। চলতি বছরের এপ্রিল মাসে তিনি প্রথম একক কনসার্ট আয়োজনের ঘোষণা দেন।
দক্ষিণ-পশ্চিম চীনের চেংদু শহরে অনুষ্ঠিত তার প্রথম দুটি কনসার্টের টিকিট অল্প সময়েই বিক্রি হয়ে যায়। অনুষ্ঠানগুলোতে ভক্তদের উপস্থিতিও ছিল উল্লেখযোগ্য। এই সফলতার পর দেশব্যাপী কনসার্ট ট্যুরের ঘোষণা দেন তিনি, যার প্রথম আয়োজন হওয়ার কথা ছিল বেইজিংয়ে।
চেংদুর অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার পর এক লাইভস্ট্রিমে নিজের পারফরম্যান্স নিয়ে আত্মবিশ্বাসী মন্তব্য করেন শি না। তিনি বলেন, পুরো অনুষ্ঠান শেষে তার ক্লান্তি অনুভূত হয়নি। মজার ছলে তিনি নিজেকে সম্ভাব্য "পপ কুইন" বলেও উল্লেখ করেন এবং ভক্তদের কাছে জানতে চান, তিনি দেশজুড়ে কনসার্ট সফর করতে পারবেন কি না।
তবে এই ঘোষণার পর থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনার ঝড় শুরু হয়। অনেক ব্যবহারকারী প্রশ্ন তোলেন, একজন পেশাদার গায়ক না হয়েও উচ্চমূল্যের টিকিটে দেশব্যাপী কনসার্ট আয়োজন কতটা যৌক্তিক। কনসার্টের টিকিটের মূল্য ৩৮০ থেকে ১ হাজার ১৮০ ইউয়ান নির্ধারণ করা হয়েছিল, যা নিয়েও নানা আলোচনা তৈরি হয়।
সমালোচকদের একাংশের দাবি, শি না নিজের গানের দক্ষতার চেয়ে তার জনপ্রিয়তা এবং তারকা বন্ধুদের পরিচিতির ওপর বেশি নির্ভর করছেন। কেউ কেউ এটিকে অতিরিক্ত অর্থ উপার্জনের উদ্যোগ বলেও মন্তব্য করেন। পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হলে কিছু ব্যক্তি প্রয়োজনীয় অনুমোদন নিয়ে প্রশ্ন তুলে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ করার কথাও জানান।
বিতর্কের মাত্রা আরও বাড়ে যখন চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমও বিষয়টি নিয়ে মন্তব্য প্রকাশ করে। ঝেজিয়াং প্রাদেশিক পার্টি কমিটির একটি বিভাগের প্রকাশিত নিবন্ধে বলা হয়, শি নার কনসার্ট সফর মানুষের মধ্যে নানা প্রশ্ন তৈরি করেছে। নিবন্ধে ইঙ্গিত দেওয়া হয়, জনপ্রিয়তার ভিত্তিতে সাংস্কৃতিক আয়োজন দীর্ঘমেয়াদে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে না এবং মানসম্পন্ন শিল্পচর্চাকে দুর্বল করতে পারে।
এর কিছুদিন পর রাষ্ট্রীয় সংবাদপত্র People's Daily-তেও একটি মন্তব্যধর্মী নিবন্ধ প্রকাশিত হয়। সেখানে কোনো ব্যক্তির নাম উল্লেখ না করলেও এমন একজন জনপ্রিয় উপস্থাপকের প্রসঙ্গ তুলে ধরা হয়, যার উল্লেখযোগ্য সংগীতকর্ম নেই। নিবন্ধে বলা হয়, প্রকৃত দক্ষতা ছাড়া শুধু জনপ্রিয়তার ওপর নির্ভর করলে দীর্ঘমেয়াদে সফল হওয়া কঠিন।
পর্যবেক্ষকদের মতে, নিবন্ধটি সরাসরি নাম উল্লেখ না করলেও সেটি শি নাকে ঘিরে চলা বিতর্কের প্রতিই ইঙ্গিত করেছে। এরই মধ্যে কনসার্ট আয়োজক প্রতিষ্ঠান ঘোষণা দেয়, বেইজিংয়ের নির্ধারিত অনুষ্ঠান বাতিল করা হচ্ছে এবং টিকিট ক্রয়কারীদের সম্পূর্ণ অর্থ ফেরত দেওয়া হবে। যদিও সরকারি কোনো নির্দেশে অনুষ্ঠানটি বাতিল হয়েছে কি না, সে বিষয়ে স্পষ্ট কিছু জানানো হয়নি। শি নাও এ বিষয়ে প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য করেননি।
বিশ্লেষকদের মতে, এই বিতর্ক শুধু একজন তারকার গানের দক্ষতা নিয়ে সীমাবদ্ধ নয়। বরং এটি চীনের বর্তমান সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার প্রতিফলন। করোনা মহামারির পর দেশটির অনেক তরুণ বেকারত্ব, অর্থনৈতিক চাপ ও আয় বৈষম্যের মুখোমুখি। অন্যদিকে সেলিব্রিটিদের বিপুল আয় ও বিলাসী জীবনযাপন নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে অসন্তোষও বাড়ছে। ফলে শি নাকে ঘিরে সমালোচনা অনেকের কাছে বৃহত্তর সামাজিক ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
কসমিক ডেস্ক