ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির মধ্যে অনুষ্ঠিত শীর্ষ বৈঠকে দুই দেশের কৌশলগত অংশীদারত্বকে আরও শক্তিশালী করার লক্ষ্যে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বৈঠকে অর্থনৈতিক সহযোগিতা, সেমিকন্ডাক্টর সরবরাহ ব্যবস্থা, প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), স্বাস্থ্যসেবা এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিসহ বিভিন্ন খাতে সহযোগিতা সম্প্রসারণের বিষয়ে আলোচনা হয়।
বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত এই বৈঠকের পর যৌথ সংবাদ সম্মেলনে নরেন্দ্র মোদি জানান, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ভারত ও জাপান একটি যৌথ রোডম্যাপ তৈরির কাজ শুরু করেছে। পাশাপাশি প্রতিরক্ষা প্রযুক্তির যৌথ উন্নয়ন, এআই, ধাতু, জ্বালানি এবং স্বাস্থ্য খাতে একাধিক সমঝোতা ও সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে।
সরকারি সফরে প্রথমবারের মতো ভারতে আসা জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি ষোড়শ ভারত-জাপান বার্ষিক সম্মেলনে অংশ নেন। সংবাদ সম্মেলনে মোদি তাকে একজন দূরদর্শী ও জনপ্রিয় নেতা হিসেবে উল্লেখ করেন। একই সঙ্গে তিনি ব্যক্তিগতভাবে তাকাইচিকে নিজের ‘ছোট বোন’ বলে সম্বোধন করেন।
মোদি বলেন, জাপানের নারা অঞ্চলের সঙ্গে ভারতের বৌদ্ধ ঐতিহ্যের দীর্ঘদিনের ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক রয়েছে, যা দুই দেশের বন্ধুত্বকে আরও গভীর করেছে।
বিশ্ব রাজনীতির পরিবর্তিত প্রেক্ষাপট এবং আন্তর্জাতিক অস্থিরতার মধ্যেও ভারত ও জাপানের সম্পর্ক আরও দৃঢ় হয়েছে বলে মন্তব্য করেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে পারস্পরিক বিশ্বাসই সবচেয়ে বড় কৌশলগত শক্তি এবং ভারত-জাপানের অংশীদারত্ব সেই আস্থার ভিত্তিতেই এগিয়ে যাচ্ছে।
ভারতের অবকাঠামো উন্নয়ন এবং শিল্পায়নে জাপানের দীর্ঘদিনের অবদানের প্রশংসা করে মোদি জানান, আগামী ১০ বছরে জাপান ভারতে ১০ ট্রিলিয়ন ইয়েন বিনিয়োগ করবে। একই সময়ে ভারতে কার্যক্রম পরিচালনাকারী জাপানি প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা দ্বিগুণ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
প্রযুক্তি খাতকে দুই দেশের সম্পর্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করে মোদি বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতে সহযোগিতা আরও জোরদার করতে একটি যৌথ বিবৃতি প্রকাশ করা হয়েছে। পাশাপাশি ভারতের বিভিন্ন শীর্ষ এআই প্রতিষ্ঠান তাদের জাপানি অংশীদারদের সঙ্গে নতুন চুক্তি করেছে। তার মতে, জাপানের উন্নত প্রযুক্তি এবং ভারতের সফটওয়্যার দক্ষতার সমন্বয় বৈশ্বিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা উন্নয়নে নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি করবে।
প্রতিরক্ষা সহযোগিতার ক্ষেত্রেও নতুন অগ্রগতির ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। মোদি জানান, দুই দেশের প্রথম যৌথ প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় নৌবাহিনীর জন্য ‘ইউনিকর্ন’ নামে একটি রেডিও অ্যান্টেনা প্রযুক্তি যৌথভাবে উন্নয়ন করা হবে। এই উদ্যোগ সামুদ্রিক নিরাপত্তা জোরদার এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
স্বাস্থ্য খাতে ওষুধ, চিকিৎসা সরঞ্জাম এবং জীবপ্রযুক্তি বিষয়ে সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়েও একাধিক সমঝোতা হয়েছে। ভারতের বৃহৎ উৎপাদন সক্ষমতা এবং জাপানের উন্নত প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে বিশ্বব্যাপী সাশ্রয়ী, নির্ভরযোগ্য এবং আধুনিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
নবায়নযোগ্য জ্বালানির ক্ষেত্রেও নতুন উদ্যোগের ঘোষণা দেন মোদি। তিনি জানান, ভারত-জাপান বায়োগ্যাস উদ্যোগের আওতায় ভারতে এক হাজার বায়োগ্যাস ও জৈব সার কারখানা স্থাপন করা হবে। এই প্রকল্প কৃষি উৎপাদন, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং পরিচ্ছন্ন জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।
দুই দেশের নেতারা আশা প্রকাশ করেন, এই সফর এবং স্বাক্ষরিত বিভিন্ন সমঝোতা ভারত-জাপান কৌশলগত অংশীদারত্বকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে এবং অর্থনীতি, প্রযুক্তি, প্রতিরক্ষা ও বৈশ্বিক উন্নয়নে উভয় দেশের সহযোগিতা আরও বিস্তৃত করবে।
কসমিক ডেস্ক