২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সরকার ১ জুলাই থেকে ধাপে ধাপে নতুন বেতন কাঠামো (পে স্কেল) বাস্তবায়নের ঘোষণা দিলেও এখনো এ বিষয়ে সরকারি গেজেট প্রকাশ না হওয়ায় সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা ও উদ্বেগ বাড়ছে। নতুন বেতন কত হবে, কোন ধাপে কার্যকর হবে, বিভিন্ন ভাতা কীভাবে যুক্ত হবে এবং অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীরা কী ধরনের সুবিধা পাবেন—এসব বিষয়ে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক নির্দেশনা না থাকায় সংশ্লিষ্টদের মধ্যে নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
২০১৫ সালের অষ্টম জাতীয় বেতন স্কেল বাস্তবায়নের সময় অধিকাংশ কাজ ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে সম্পন্ন হলেও বর্তমানে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা, ইনক্রিমেন্ট, পেনশন, গ্র্যাচুইটি, জেনারেল প্রভিডেন্ট ফান্ড (জিপিএফ) এবং অন্যান্য আর্থিক কার্যক্রম ইলেকট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফার (ইএফটি) ও আইবাস (IBAS) সফটওয়্যারের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। ফলে ধাপে ধাপে নতুন বেসিক বেতন কার্যকর করতে গেলে বিদ্যমান সফটওয়্যার কাঠামোয় বড় ধরনের পরিবর্তনের প্রয়োজন হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
অর্থ মন্ত্রণালয়, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে, নতুন বেতন কাঠামোর একটি খসড়া রূপরেখা প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। তবে আর্থিক সক্ষমতা, প্রশাসনিক বাস্তবতা এবং বিদ্যমান ডিজিটাল বেতন ব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্য নিশ্চিত করেই সরকার গেজেট প্রকাশ করতে চায়। সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে সেপ্টেম্বর মাসের মাঝামাঝি থেকে শেষ সপ্তাহের মধ্যে গেজেট প্রকাশ হতে পারে। যদিও নতুন বেতন কাঠামোর কার্যকারিতা ১ জুলাই থেকেই গণনা করা হতে পারে। সে ক্ষেত্রে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বকেয়াসহ বেতন বৃদ্ধির সুবিধা পাবেন।
সরকারি চাকরিজীবীদের একটি বড় অংশের অভিযোগ, বাস্তবায়নের ঘোষণা দেওয়া হলেও গেজেট ছাড়া প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হচ্ছে না। প্রতিদিন বিভিন্ন দপ্তরে এবং গণমাধ্যমে নতুন বেতন কাঠামো নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। বিশেষ করে অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে উদ্বেগ বেশি। তারা এখন আর সরকারি প্রশাসনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত না থাকায় সরকারি কোনো আনুষ্ঠানিক তথ্যও সহজে পাচ্ছেন না। ফলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনের ওপর নির্ভর করেই পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করছেন।
একই সঙ্গে সাধারণ মানুষের মধ্যেও মূল্যস্ফীতি নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। অনেকের আশঙ্কা, সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়লে বাজারে আবারও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়ে যেতে পারে। অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, নতুন পে স্কেল বাস্তবায়নের পাশাপাশি মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণেও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।
বাংলাদেশ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী কল্যাণ সমিতির আহ্বায়ক আব্দুল মালেক বলেন, বর্তমানে সব বেতন নির্ধারণ সফটওয়্যারের মাধ্যমে হওয়ায় আগের মতো হাতে পে-ফিক্সেশন করার সুযোগ নেই। যদি ধাপে ধাপে বেসিক বেতন কার্যকর করা হয়, তাহলে একই কর্মচারীর জন্য একাধিকবার পে-ফিক্সেশন করতে হবে। এতে সফটওয়্যার পরিবর্তনের পাশাপাশি প্রশাসনিক জটিলতা ও ভুল হওয়ার ঝুঁকিও বাড়বে।
তিনি আরও বলেন, পদোন্নতি, বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট, টাইম স্কেল, সিলেকশন গ্রেড এবং অবসরজনিত সুবিধা নির্ধারণেও জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে। বিশেষ করে যেসব কর্মকর্তা-কর্মচারী পিআরএল শেষে অবসরে যাচ্ছেন, তাদের উদ্বেগ আরও বেশি। কারণ পেনশন, গ্র্যাচুইটি, ছুটির নগদায়নসহ প্রায় সব আর্থিক সুবিধা শেষ প্রাপ্ত বেতনের ভিত্তিতেই নির্ধারিত হয়। ডিজিটাল বেতন ব্যবস্থায় অবসরপ্রাপ্তদের সুবিধা দুই বা তিন ধাপে দেওয়ার সুযোগ না থাকায় বিষয়টি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে আব্দুল মালেক বিকল্প হিসেবে প্রথম ধাপেই শতভাগ মূল বেতন কার্যকর করে পে-ফিক্সেশন সম্পন্ন করার প্রস্তাব দিয়েছেন। পরে বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ভাতা ও অন্যান্য সুবিধা ধাপে ধাপে কার্যকর করলে সফটওয়্যার পরিবর্তনের প্রয়োজন কমবে এবং অবসরপ্রাপ্তরাও বৈষম্যের শিকার হবেন না বলে তিনি মত দেন।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, উচ্চপর্যায়ের সচিব কমিটি ইতোমধ্যে নতুন বেতন কাঠামোর রূপরেখা তৈরি করেছে। বর্তমানে এর আর্থিক প্রভাব, সফটওয়্যার সামঞ্জস্য এবং প্রশাসনিক বিষয়গুলো পর্যালোচনা করা হচ্ছে। সবকিছু চূড়ান্ত হওয়ার পরই গেজেট প্রকাশ করা হবে।
প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেছেন, দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায় রেখেই নতুন পে স্কেল বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘ ১১ বছর পর সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধি সময়োপযোগী উদ্যোগ হলেও এর সামষ্টিক অর্থনৈতিক প্রভাব অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে পরিচালনা করতে হবে। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, সরকারি কর্মচারীদের ক্রয়ক্ষমতা বাড়াতে বেতন বৃদ্ধি প্রয়োজন। তবে একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতির ওপর সম্ভাব্য চাপ নিয়ন্ত্রণ এবং আর্থিক শৃঙ্খলা বজায় রাখাও সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হবে।
এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবদুল মজিদও মনে করেন, সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বৃদ্ধির যৌক্তিকতা রয়েছে। তবে একই সঙ্গে বাজার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ এবং সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বিবেচনায় রেখে অর্থনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখাও জরুরি। সাবেক অর্থ সচিব মাহবুব আহমেদও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন।
কসমিক ডেস্ক