দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে থাইল্যান্ড ও বার্মা (বর্তমান মায়ানমার) অঞ্চলের আকাশে পরিচালিত একটি গোপন গোয়েন্দা অভিযানে নিখোঁজ হওয়া ২১ বছর বয়সী মার্কিন বিমানসেনা ফ্র্যাঙ্কলিন এইচ. ম্যাককিনির পরিচয় অবশেষে নিশ্চিত করেছে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী। দীর্ঘ ৮১ বছরের অনুসন্ধান, তদন্ত ও আধুনিক ফরেনসিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে এই রহস্যের অবসান হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধবন্দি ও নিখোঁজ সামরিক সদস্যদের হিসাব সংরক্ষণকারী সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ফ্র্যাঙ্কলিন এইচ. ম্যাককিনি যুক্তরাষ্ট্রের রোড আইল্যান্ডের বাসিন্দা ছিলেন। তিনি মার্কিন সেনাবাহিনীর বিমানবাহিনীর ১৪তম এয়ার ফোর্সের ৩৫তম ফটো রিকনেসান্স স্কোয়াড্রনের একজন পাইলট হিসেবে দায়িত্ব পালন করতেন। এই স্কোয়াড্রন ‘রেডহকস’ নামে পরিচিত ছিল এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ঝুঁকিপূর্ণ ও গোপন গোয়েন্দা অভিযানের জন্য বিশেষভাবে খ্যাত ছিল।
সংস্থাটি জানায়, ১৯৪৪ সালের ৫ নভেম্বর ম্যাককিনি চীনের ইউনান প্রদেশের একটি সামরিক ঘাঁটি থেকে উড্ডয়ন করেন। তার দায়িত্ব ছিল বার্মা ও থাইল্যান্ডের আকাশে নজরদারি চালিয়ে গুরুত্বপূর্ণ গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করা। তবে সেই নির্দিষ্ট অভিযানের লক্ষ্য বা উদ্দেশ্য এখনো প্রকাশ করা হয়নি।
উড্ডয়নের কিছু সময় পরই তার উড়োজাহাজের সঙ্গে যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এরপর তিনি আর কখনো ঘাঁটিতে ফিরে আসেননি। সে সময় ব্যাপক অনুসন্ধান চালানো হলেও বিমান দুর্ঘটনার কোনো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ কিংবা তার মরদেহ উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। যুদ্ধ শেষে তাকে নিখোঁজ ঘোষণা করা হয় এবং ফিলিপাইনের ম্যানিলায় অবস্থিত আমেরিকান সামরিক সমাধিক্ষেত্রের নিখোঁজ সেনাদের স্মৃতিফলকে তার নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
দীর্ঘ কয়েক দশক পর নতুন করে অনুসন্ধান শুরু হলে গুরুত্বপূর্ণ একটি সূত্র পাওয়া যায়। তদন্তকারীরা থাইল্যান্ডের রয়্যাল থাই এয়ার ফোর্স জাদুঘরে সংরক্ষিত একটি যুদ্ধকালীন প্রতিবেদনে উল্লেখ পান যে, ম্যাককিনি নিখোঁজ হওয়ার দিন একটি বিমান বজ্রপাতের কবলে পড়ে বিস্ফোরিত হয়েছিল। প্রতিবেদনে বলা হয়, বিমানটি থাইল্যান্ডের লামপাং প্রদেশের একটি বনাঞ্চলে বিধ্বস্ত হয়েছিল।
এই তথ্যের ভিত্তিতে ২০১৮ সালে গবেষকদের একটি দল ঘটনাস্থল হিসেবে চিহ্নিত এলাকায় অনুসন্ধান চালায় এবং একটি ধানক্ষেতের পাশের সম্ভাব্য বিমান বিধ্বস্তের স্থান শনাক্ত করে। পরবর্তী সময়ে ২০১৯ এবং ২০২১ সালে বিশেষজ্ঞরা সেখানে আরও বিস্তারিত তদন্ত পরিচালনা করেন।
অবশেষে ২০২২ সালে পরিচালিত খনন অভিযানে ঘটনাস্থল থেকে মানুষের মরদেহের সম্ভাব্য কিছু অংশ উদ্ধার করা হয়। পরে আধুনিক ফরেনসিক প্রযুক্তি ও বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত করা হয়, উদ্ধার হওয়া নমুনাগুলো ফ্র্যাঙ্কলিন এইচ. ম্যাককিনিরই মরদেহের অংশ।
পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ম্যাককিনির পরিবারের সদস্যদের আনুষ্ঠানিকভাবে বিষয়টি জানানো হবে। পাশাপাশি ম্যানিলার আমেরিকান সামরিক সমাধিক্ষেত্রে নিখোঁজ সেনাদের স্মৃতিফলকে তার নামের পাশে একটি গোলাপ চিহ্ন যুক্ত করা হবে, যা পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
এ ছাড়া তাকে পূর্ণ সামরিক মর্যাদায় দাফনের ব্যবস্থাও করা হবে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। দীর্ঘ আট দশকেরও বেশি সময় পর একজন নিখোঁজ মার্কিন বিমানসেনার পরিচয় নিশ্চিত হওয়াকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-সংক্রান্ত অনুসন্ধান কার্যক্রমের একটি গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আধুনিক ফরেনসিক প্রযুক্তি, ঐতিহাসিক নথি এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার সমন্বয়ে বহু বছর ধরে অমীমাংসিত থাকা যুদ্ধকালীন নিখোঁজদের পরিচয় শনাক্ত করা এখন আরও কার্যকর হচ্ছে। ফ্র্যাঙ্কলিন এইচ. ম্যাককিনির পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার ঘটনাও সেই প্রচেষ্টার একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ।
কসমিক ডেস্ক