চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) দেশের জ্বালানি খাতে বড় ধরনের সংকোচন দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এ সময়ে বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পানি সরবরাহ খাতে মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে ঋণাত্মক ১০ দশমিক ৭০ শতাংশে। বিশ্লেষকদের মতে, জ্বালানি খাতের এই অস্থিরতা অর্থনীতির অন্যান্য খাতেও পরোক্ষ চাপ তৈরি করছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিল্প উৎপাদন, পরিবহন ও সেবা খাতের কার্যক্রম অনেকাংশেই নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহের ওপর নির্ভরশীল। জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা, আমদানিনির্ভর জ্বালানির ব্যয় বৃদ্ধি এবং সরবরাহ শৃঙ্খলে বিঘ্ন উৎপাদন খরচ বাড়িয়ে দিচ্ছে। এর প্রভাব সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপরও পড়ছে।
তবে জ্বালানি খাতের দুর্বলতার বিপরীতে সামগ্রিক অর্থনীতিতে কিছুটা ইতিবাচক গতি ফিরেছে। গত মঙ্গলবার প্রকাশিত বিবিএসের প্রতিবেদনে দেখা গেছে, রাজনৈতিক অস্থিরতায় ক্ষতিগ্রস্ত ২০২৪-২৫ অর্থবছরের একই প্রান্তিকে যেখানে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ছিল মাত্র ১ দশমিক ৮১ শতাংশ, সেখানে চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে তা প্রায় আড়াই গুণ বেড়েছে। এমনকি আগের অর্থবছরের শেষ প্রান্তিকের (এপ্রিল-জুন) ২ দশমিক ৪৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধির তুলনায়ও বর্তমান প্রবৃদ্ধি প্রায় দ্বিগুণ।
বিবিএস কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, কৃষি, শিল্প ও সেবা—এই তিনটি প্রধান খাতেই তুলনামূলক ভালো পারফরম্যান্স অর্থনীতিতে গতি ফেরাতে ভূমিকা রেখেছে। আগের বছরের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তনের অভিঘাত ধীরে ধীরে কাটতে শুরু করায় উৎপাদন ও বিনিয়োগ কার্যক্রম কিছুটা স্বাভাবিক হচ্ছে।
প্রতিবেদনে দেখা যায়, চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে শিল্প খাতে প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ৬ দশমিক ৯৭ শতাংশে, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ৩ দশমিক ৫৯ শতাংশ। শিল্প খাতের মধ্যে নির্মাণ খাত সবচেয়ে বড় অবদান রেখেছে। এ খাতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১২ দশমিক ৪১ শতাংশ, যেখানে এক বছর আগে তা ছিল মাত্র ১ দশমিক ৯০ শতাংশ।
কৃষি খাতেও ইতিবাচক পরিবর্তনের চিত্র উঠে এসেছে। সবচেয়ে বেশি কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী এই খাতে প্রবৃদ্ধি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ দশমিক ৩০ শতাংশে। আগের অর্থবছরের একই সময়ে কৃষি খাতে প্রবৃদ্ধি ছিল ঋণাত্মক শূন্য দশমিক ৬০ শতাংশ। একই সঙ্গে সেবা খাতের প্রবৃদ্ধিও বেড়ে ৩ দশমিক ৬৭ শতাংশে পৌঁছেছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ (বিআইআইএসএস)-এর গবেষণা পরিচালক ড. মাহফুজ কবীর বলেন, নির্মাণ ও শিল্প খাতে প্রবৃদ্ধি আশাব্যঞ্জক হলেও জ্বালানি খাতে দীর্ঘস্থায়ী সংকট থাকলে এই গতি ধরে রাখা কঠিন হবে। তার মতে, উৎপাদনমুখী খাতগুলোর জন্য নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
তিনি আরও বলেন, গত অর্থবছরের খুব কম প্রবৃদ্ধির কারণে চলতি অর্থবছরের প্রবৃদ্ধিতে ‘ভিত্তি প্রভাব’ কাজ করছে। তবে নির্মাণ খাতে দুই অঙ্কের প্রবৃদ্ধি বাস্তব অর্থনৈতিক কার্যক্রমে ফেরার একটি ইতিবাচক ইঙ্গিত। অর্থনীতির পুনরুদ্ধার টেকসই করতে হলে চলতি অর্থবছরের বাকি সময়ে মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, জ্বালানি খাতে স্থিতিশীলতা আনা এবং সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানোর দিকে নীতিনির্ধারকদের কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
উল্লেখ্য, নীতিনির্ধারকদের তাৎক্ষণিকভাবে অর্থনীতির অবস্থা মূল্যায়নের সুবিধার্থে ২০২৩-২৪ অর্থবছর থেকে বিবিএস নিয়মিত ত্রৈমাসিক জিডিপি তথ্য প্রকাশ করছে।
কসমিক ডেস্ক