ভারতে পালিয়ে যাওয়া আওয়ামী লীগ সরকারের সময়কার প্রভাবশালী পুলিশ কর্মকর্তা মাহবুব হোসেনের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, দুর্নীতি এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত পুলিশিংয়ের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) সাবেক এই অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক দীর্ঘ সময় ধরে রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা ব্যবস্থাকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করেছেন বলে অভিযোগ করছেন সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো।
অষ্টম ব্যাচের এই পুলিশ কর্মকর্তা প্রায় এক দশক ধরে এসবির রাজনৈতিক শাখায় ডিআইজি ও পরে অতিরিক্ত আইজিপি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। অভিযোগ রয়েছে, ওই সময় এসবিকে কেন্দ্র করে একটি প্রভাবশালী চক্র গড়ে ওঠে, যার নেতৃত্বে ছিলেন মাহবুব হোসেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর তিনি দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান।
সূত্রগুলোর দাবি, দায়িত্বে থাকাকালে তিনি অবৈধভাবে দোকান দখল, অর্থ আত্মসাৎ এবং বিদেশে অর্থ পাচারের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) প্রাথমিক অনুসন্ধানে মালয়েশিয়ার পুত্রাযায়ায় তাঁর স্ত্রীর নামে একটি ডুপ্লেক্স বাড়ির তথ্য উঠে এসেছে বলে জানা গেছে।
পুলিশ ও প্রশাসনের একাধিক সূত্র বলছে, মাহবুব হোসেন নামে–বেনামে বিপুল পরিমাণ সম্পদ গড়ে তুলেছেন। ঢাকার নিউ ইস্কাটন এলাকায় তাঁর ও তাঁর স্ত্রীর নামে একাধিক বিলাসবহুল ফ্ল্যাট রয়েছে। মুন্সীগঞ্জে গ্রামের বাড়িতে শতবিঘার বেশি জমি কেনার তথ্য পাওয়া গেছে। মিরপুরের মাজার রোড এলাকায় প্রায় এক বিঘা জমিতে তাঁর স্ত্রীর নামে একটি বড় টিনশেড স্থাপনাও রয়েছে, যার বাজারমূল্য উল্লেখযোগ্য।
এছাড়া মালয়েশিয়ায় কয়েক কোটি টাকার সম্পদ এবং ঢাকার মগবাজারে একটি অভিজাত রেস্টুরেন্টে তাঁর মালিকানার অভিযোগও রয়েছে। সরকার পতনের পর ওই রেস্টুরেন্টের মালিকানা কৌশলে পরিবর্তন করা হলেও তাঁর শেয়ার রয়ে গেছে বলে দাবি করা হচ্ছে।
ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগের মধ্যে রয়েছে—বায়তুল মোকাররম এলাকায় পেশিশক্তি ব্যবহার করে দুটি দোকান দখল। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দোকানগুলো দখলমুক্ত করা হয়। ওই ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীরা জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে বিক্ষোভও করেন।
পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মাহবুব হোসেনের প্রধান পৃষ্ঠপোষক ছিলেন সাবেক আইজিপি এ কে এম শহীদুল হক। তাঁর আশকারায় মাহবুব আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠেন বলে অভিযোগ রয়েছে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে তাঁদের যৌথ বিনিয়োগ ও আর্থিক সম্পর্কের কথাও উঠে এসেছে।
এসবিতে দায়িত্ব পালনকালে রাজনৈতিক দলগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করাই ছিল তাঁর প্রধান কাজ—এমন অভিযোগ রয়েছে। ছোট রাজনৈতিক দলগুলোকে সরকারি সোর্স মানি দিয়ে প্রভাবিত করা, বিরোধী মতের ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মামলা দেওয়া এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরকারের সমালোচকদের তালিকা তৈরি করে বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থায় পাঠানোর অভিযোগও রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।
মাঠ প্রশাসনের নির্দেশনায় সন্দেহভাজন ব্যক্তি ও যানবাহনে ব্যাপক তল্লাশি, সভা-সমাবেশ ঠেকাতে নজরদারি, এমনকি সাইবার পর্যবেক্ষণ জোরদারের নির্দেশ দেওয়া হতো এসবি থেকে। এতে সাধারণ মানুষ নানা হয়রানির শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
একজন রাজনৈতিক দলের নেতা, যিনি পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছুক, দাবি করেছেন—২০১৪ সালের নির্বাচনের সময় তাঁকে নির্বাচনে অংশ নিতে চাপ দেওয়া হয়েছিল এবং অর্থের প্রস্তাবও দেওয়া হয়। তিনি তা প্রত্যাখ্যান করায় পরে মামলার মুখে পড়েন বলে অভিযোগ করেন।
পুলিশ সদর দপ্তরের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, সোর্স মানির বড় অংশ আত্মসাৎ করতেন মাহবুব হোসেন। তাঁর ঘনিষ্ঠদের নিয়ে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে ওঠে, যার সঙ্গে আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতার যোগাযোগ ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।
মাহবুব হোসেনের বিরুদ্ধে ওঠা এসব অভিযোগ বর্তমানে বিভিন্ন সংস্থার নজরে রয়েছে। দুদক তাঁর সম্পদের অনুসন্ধান চালাচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। তবে এসব অভিযোগ বিষয়ে মাহবুব হোসেনের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।