ভালো থাকতে সুষম খাবার প্রয়োজন—এ কথা সবারই জানা। তবে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শরীরের চাহিদা একই রকম থাকে না। যে খাবার শৈশবে অত্যন্ত জরুরি, তা প্রাপ্তবয়স্ক বা বার্ধক্যে এসে কম প্রয়োজনীয় হতে পারে। আবার বয়স বাড়ার সঙ্গে কিছু পুষ্টি উপাদানের গুরুত্ব আরও বেড়ে যায়। তাই সুস্থ জীবন নিশ্চিত করতে বয়স অনুযায়ী খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন আনা জরুরি।
পুষ্টি ও বয়সের সম্পর্ক বোঝাতে ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ রয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যুক্তরাজ্যে খাদ্যসংকটের কারণে সরকার রেশনিং ব্যবস্থা চালু করেছিল। তখন প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য চিনি বরাদ্দ থাকলেও দুই বছরের কম বয়সী শিশুদের জন্য চিনি দেওয়া হতো না। পরবর্তীকালে গবেষণায় দেখা যায়, জীবনের শুরুতে কম চিনি গ্রহণ ভবিষ্যতের স্বাস্থ্যের ওপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
২০২৫ সালে প্রকাশিত এক গবেষণায় যুক্তরাজ্যে ১৯৫১ থেকে ১৯৫৬ সালের মধ্যে জন্ম নেওয়া প্রায় ৬৩ হাজার মানুষের স্বাস্থ্যতথ্য বিশ্লেষণ করা হয়। এতে দেখা যায়, যেসব মানুষ গর্ভকাল ও জীবনের প্রথম এক হাজার দিনে কম চিনি গ্রহণ করেছিলেন, তাদের পরবর্তী জীবনে হৃদরোগ, হার্ট ফেইলিউর ও স্ট্রোকের ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে কম ছিল। এই গবেষণা ইঙ্গিত দেয়—সব বয়সেই অতিরিক্ত চিনি ক্ষতিকর।
শৈশব ও কৈশোরে শরীর ও মস্তিষ্ক দ্রুত বিকাশ লাভ করে। এই সময়ে পর্যাপ্ত পুষ্টি না পেলে তার প্রভাব সারা জীবনে রয়ে যেতে পারে। শিশুদের জন্য দুধ ও দুগ্ধজাত খাবারের চর্বি উপকারী হলেও বড়দের ক্ষেত্রে তা সীমিত রাখা ভালো।
এই বয়সে আয়রন, আয়োডিন, ক্যালসিয়াম, ভিটামিন ডি ও অন্যান্য ভিটামিন রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ও মস্তিষ্কের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ফল, শাকসবজি, ডাল, পূর্ণ শস্য, বাদাম ও বীজ নিয়মিত খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তোলা দরকার। বাংলাদেশের বাস্তবতায় ছোট মাছ, শাক, ডাল ও মৌসুমি ফল শিশুদের জন্য সহজলভ্য ও পুষ্টিকর খাদ্য।
এই সময় হাড় ও পেশি গঠনের শেষ ধাপ সম্পন্ন হয়। পড়াশোনা, কাজ ও মানসিক চাপের কারণে শরীরের পুষ্টির চাহিদা বাড়ে। ক্যালসিয়াম, ভিটামিন ডি, আয়রন, প্রোটিন ও বি-ভিটামিন এই বয়সে বিশেষভাবে প্রয়োজন।
যাদের মাসিক হয়, তাদের আয়রনের ঘাটতির ঝুঁকি বেশি থাকে। তাই খাদ্যতালিকায় শাকসবজি, ডাল, মাছ, ডিম ও পরিমিত মাংস রাখা জরুরি। গবেষণায় দেখা গেছে, এই বয়সে ফল ও কম প্রক্রিয়াজাত খাবার মানসিক স্বাস্থ্যের জন্যও উপকারী।
মধ্য বয়সে এসে ভবিষ্যতের স্বাস্থ্য ঝুঁকি মাথায় রেখে খাদ্য নির্বাচন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। বিশেষ করে নারীদের ক্ষেত্রে হাড় ক্ষয়, ওজন বৃদ্ধি ও হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
এই সময় ফল, শাকসবজি, পূর্ণ শস্য, বাদাম, ডাল, স্বাস্থ্যকর চর্বি ও কম চর্বিযুক্ত দুগ্ধজাত খাবার নিয়মিত খাওয়া সুস্থ বার্ধক্যের ভিত্তি তৈরি করে। সামুদ্রিক মাছের ওমেগা-থ্রি ফ্যাটি অ্যাসিড হৃদরোগের ঝুঁকি কমাতে সহায়ক। পাশাপাশি পেশি ক্ষয় রোধে পর্যাপ্ত প্রোটিন গ্রহণ জরুরি।
বয়স বাড়লে শরীরের শক্তির চাহিদা কমে যায়, কিন্তু পুষ্টির প্রয়োজন কমে না। বরং ক্যালসিয়াম, ভিটামিন ডি ও ভালো মানের প্রোটিনের গুরুত্ব আরও বেড়ে যায়।
দুধ, দই, ছোট মাছ, শাকসবজি ও ডাল ক্যালসিয়ামের ভালো উৎস। রোদে কিছু সময় কাটানো ও তৈলাক্ত মাছ খেলে ভিটামিন ডি পাওয়া সম্ভব। এ বয়সে হজমের সমস্যা দেখা দিতে পারে—ফল ও শাকসবজির ফাইবার অন্ত্রের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে সাহায্য করে।