আজ ২১ ডিসেম্বর। এই দিনে বাংলাদেশের মানুষের হৃদয়ে নতুন করে জেগে ওঠে মরমী সাধক, আধ্যাত্মিক কবি ও গীতিকার হাসন রাজার স্মৃতি। সুর ও ছন্দের সীমা ছাড়িয়ে তিনি মানুষের অন্তরের গভ্রতর অনুভূতি, প্রেম এবং ঈশ্বরের সঙ্গে আত্মিক সম্পর্ককে ভাষা ও গানে রূপ দিয়েছিলেন। তাঁর সৃষ্টি আজও সময়ের গণ্ডি পেরিয়ে মানুষের মনে অনুরণন তোলে।
১৮৫৪ সালের ২১ ডিসেম্বর সুনামগঞ্জ জেলার লক্ষণশ্রী গ্রামে এক দানশীল জমিদার পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন দেওয়ান হাসন রাজা। তাঁর পিতা ছিলেন জমিদার দেওয়ান আলী রাজা চৌধুরী এবং মাতা হুরমত জাহান বিবি। পারিবারিক ঐতিহ্য অনুযায়ী শিক্ষা ও সামাজিক পরিবেশেই তাঁর শৈশব ও কৈশোর গড়ে ওঠে। প্রথাগত শিক্ষার বাইরে গৃহশিক্ষা ও পারিপার্শ্বিক অভিজ্ঞতাই ছিল তাঁর জ্ঞানের প্রধান ভিত্তি।
অল্প বয়সে পিতার মৃত্যুর পর জমিদারি দায়িত্ব গ্রহণ করেন হাসন রাজা। জীবনের প্রথম অধ্যায়ে তিনি ভোগ-বিলাস ও সামাজিক দায়িত্বে যুক্ত থাকলেও এক সময় তাঁর মনে গভীর পরিবর্তন আসে। পার্থিব সুখের ক্ষণস্থায়িত্ব উপলব্ধি করে তিনি আত্মিক শান্তির সন্ধানে আত্মনিয়োগ করেন। এই উপলব্ধিই তাঁকে ধীরে ধীরে আধ্যাত্মিক সাধনার পথে নিয়ে যায়।
এই সাধনার পথেই জন্ম নেয় তাঁর মরমী গান। প্রেম, ভক্তি, আত্মঅনুসন্ধান ও ঈশ্বরের প্রতি গভীর আকুলতা তাঁর গানের মূল সুর হয়ে ওঠে। নিজেকে কখনো ‘উদাসী’, কখনো ‘দেওয়ানা’, আবার কখনো ‘পাগলা হাসন রাজা’ বলে উল্লেখ করে তিনি প্রকাশ করেছেন আত্মবিস্মৃত প্রেমের এক অনন্য অনুভূতি। সহজ ভাষা ও সরল সুরে তিনি জীবনের গভীর দর্শন তুলে ধরেছেন, যা সাধারণ মানুষের হৃদয় স্পর্শ করতে সক্ষম হয়েছে।
হাসন রাজার গান শুধু সংগীত নয়, বরং এক ধরনের আধ্যাত্মিক ভাষ্য। তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘হাসন উদাস’-এ সংকলিত গানগুলো সেই সময়ের সমাজে গভীর প্রভাব ফেলেছিল এবং আজও লোকসংগীতের গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হিসেবে বিবেচিত। ধর্ম, বর্ণ বা সম্প্রদায়ের সীমারেখা অতিক্রম করে তাঁর গান মানুষের মধ্যে ঐক্য ও মানবপ্রেমের বার্তা ছড়িয়ে দিয়েছে।
আজ তাঁর জন্মদিনে হাসন রাজার সৃষ্টি আমাদের মনে করিয়ে দেয়—মানুষের অন্তরের প্রেমই হতে পারে ঈশ্বরের পথে যাত্রার প্রথম ধাপ। সময় বদলায়, সমাজ বদলায়, কিন্তু তাঁর সুর ও দর্শন আজও মানবহৃদয়ের গভীরে একইভাবে আলো জ্বেলে রাখে। এই চিরন্তন উত্তরাধিকারই হাসন রাজাকে যুগে যুগে প্রাসঙ্গিক করে রেখেছে।
কসমিক ডেস্ক