বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ হরমুজ প্রণালীকে কেন্দ্র করে নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে। এই প্রণালী দিয়ে চলাচলকারী জাহাজগুলোর কাছ থেকে ইরান টোল বা যাতায়াত মাশুল আদায় করছে—এমন অভিযোগের প্রেক্ষিতে কঠোর অবস্থান নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ওয়াশিংটন স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, ইরানকে কোনো ধরনের অর্থ প্রদান করলে সংশ্লিষ্ট জাহাজ কোম্পানিগুলো মার্কিন নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়বে।
এই সতর্কবার্তার মাধ্যমে বোঝা যাচ্ছে, কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে টানাপোড়েন আরও বাড়ছে। বিশেষ করে সাম্প্রতিক সংঘাত পরিস্থিতির কারণে বিষয়টি আরও সংবেদনশীল হয়ে উঠেছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই হরমুজ প্রণালীতে উত্তেজনা বাড়তে থাকে। ওই সময় থেকেই ইরান জাহাজ চলাচলে বাধা দেওয়া শুরু করে বলে জানা যায়। এক পর্যায়ে পরিস্থিতি এমন দাঁড়ায় যে, এই গুরুত্বপূর্ণ পথটি কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। পরে কিছু শর্তের ভিত্তিতে সীমিত আকারে জাহাজ চলাচলের অনুমতি দেওয়া হয়।
তবে নতুন করে অভিযোগ উঠেছে, ইরান তাদের উপকূলসংলগ্ন নিরাপদ রুট ব্যবহার করার সুযোগ দিয়ে বিভিন্ন জাহাজের কাছ থেকে অর্থ আদায় করছে। এই অর্থ আদায়কে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনার হুঁশিয়ারি দিয়েছে।
শুক্রবার (১ মে) দেওয়া মার্কিন সতর্কবার্তায় বলা হয়েছে, শুধু নগদ অর্থ নয়—ডিজিটাল মুদ্রা, দাতব্য অনুদান কিংবা অনানুষ্ঠানিক কোনো আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমেও যদি ইরানকে অর্থ প্রদান করা হয়, তবুও তা শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে। এমনকি ইরানি দূতাবাসের মাধ্যমে অর্থ দেওয়া হলেও সেটিও নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়বে।
ওয়াশিংটনের এই কঠোর অবস্থানের পেছনে মূল উদ্দেশ্য হলো, ইরানের অর্থনৈতিক সক্ষমতা দুর্বল রাখা। যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরেই চেষ্টা করে আসছে, যাতে ইরান তেল রপ্তানি বা অন্যান্য উৎস থেকে বড় ধরনের রাজস্ব অর্জন করতে না পারে। সেই ধারাবাহিকতায় এবার হরমুজ প্রণালীকে কেন্দ্র করে নতুন করে চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে।
এরই অংশ হিসেবে গত ১৩ এপ্রিল থেকে ইরানের বন্দরগুলোতে নৌ অবরোধ আরোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। এই অবরোধের ফলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যেও প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, তাদের কঠোর নজরদারির কারণে অন্তত ৪৮টি বাণিজ্যিক জাহাজকে পথ পরিবর্তন করতে বাধ্য করা হয়েছে।
হরমুজ প্রণালী বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি পথ। মধ্যপ্রাচ্যের তেল ও গ্যাস রপ্তানির বড় অংশ এই প্রণালী দিয়ে বিশ্ববাজারে পৌঁছে। ফলে এখানে যেকোনো ধরনের অস্থিরতা সরাসরি বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে প্রভাব ফেলে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে এই জলপথ ঘিরে পাল্টাপাল্টি পদক্ষেপ বিশ্ব অর্থনীতিতে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যদি উত্তেজনা আরও বাড়ে, তাহলে তেলের দাম বৃদ্ধি, সরবরাহ সংকট এবং পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে।
সব মিলিয়ে হরমুজ প্রণালীকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের এই বিরোধ আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য বড় একটি চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে। পরিস্থিতি কোন দিকে গড়ায়, তা এখন বিশ্বজুড়ে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
কসমিক ডেস্ক