ঢাকার উপকণ্ঠে পূর্বাচলের কাছাকাছি এক সময় ছিল এক শান্ত, সবুজ পল্লি। ভোরের হালকা বৃষ্টি সেখানে প্রায় এক বর্গকিলোমিটারজুড়ে বিস্তৃত দূর্বাঘাসভরা ভূমিকে ভিজিয়ে দিত। বজ্রপাত আর বিদ্যুতের ঝলকানি সেই পরিবেশকে আরও নাটকীয় করে তুলত। এখনো সেখানে দাঁড়িয়ে থাকা অর্ধঢেউখেলানো ঢাল যেন এক সময়কার ঘন শালবনের নিঃশব্দ স্মৃতি বহন করে চলছে।
একসময় এই অঞ্চলটি ছিল জীববৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ। গ্রামবাসীর জীবন, কৃষি ও প্রকৃতি—সবকিছুই একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত ছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই চিত্র বদলে যেতে থাকে। রাজউকের রাজউক (RAJUK)-এর পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পের বিস্তৃত উন্নয়ন পরিকল্পনা ধীরে ধীরে এই এলাকার প্রাকৃতিক ভারসাম্যকে বদলে দেয়।
উন্নয়ন কাজের ফলে একদিকে যেমন মানুষের বসতি ও অবকাঠামো তৈরি হচ্ছে, অন্যদিকে তেমনি হারিয়ে যাচ্ছে বহু বছর ধরে গড়ে ওঠা প্রাকৃতিক পরিবেশ। গাছপালা কেটে ফেলা, জলাভূমি ভরাট এবং ভূমির ব্যবহার পরিবর্তনের কারণে এখানে বসবাসকারী অনেক প্রাণীর স্বাভাবিক আবাসস্থল নষ্ট হয়ে গেছে।
এই এলাকার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জীব ছিল কোলাব্যাঙ। প্রাকৃতিক জলাশয় ও ভেজা ঘাসভূমি তাদের প্রজননের জন্য আদর্শ পরিবেশ তৈরি করেছিল। বর্ষার সময় এই এলাকাটি হয়ে উঠত তাদের মিলন ও প্রজননের এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। কিন্তু এখন সেই দৃশ্য আগের মতো আর চোখে পড়ে না।
বৃষ্টির পর ভেজা মাটিতে যে অসংখ্য কোলাব্যাঙের ডাক শোনা যেত, তা এখন অনেকটাই স্তব্ধ। যেসব জলাভূমি তাদের ডিম পাড়ার স্থান ছিল, সেগুলোর অনেকাংশই এখন ভরাট হয়ে গেছে বা নির্মাণকাজের কারণে হারিয়ে গেছে। ফলে এই প্রাণীগুলোর প্রজনন চক্রও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
পরিবেশবিদদের মতে, এই ধরনের ছোট প্রাণীর সংখ্যা কমে যাওয়া একটি বড় ইকোসিস্টেম পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। কারণ কোলাব্যাঙ শুধু একটি প্রাণী নয়, বরং খাদ্যশৃঙ্খলের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাদের সংখ্যা কমে গেলে পুরো প্রাকৃতিক ভারসাম্যে প্রভাব পড়ে।
পূর্বাচলের এই পরিবর্তন শুধু কোলাব্যাঙের জন্যই নয়, বরং পুরো এলাকার জীববৈচিত্র্যের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। একসময় যেখানে পাখি, কীটপতঙ্গ এবং উভচর প্রাণীদের সমৃদ্ধ উপস্থিতি ছিল, সেখানে এখন ধীরে ধীরে সেই বৈচিত্র্য কমে আসছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অনেকেই মনে করেন, উন্নয়ন অবশ্যই প্রয়োজন, তবে তা যদি প্রকৃতির ভারসাম্য নষ্ট করে হয়, তাহলে ভবিষ্যতে এর নেতিবাচক প্রভাব আরও গভীর হতে পারে। তারা বলেন, কিছু প্রাকৃতিক জলাভূমি ও সবুজ এলাকা সংরক্ষণ করা গেলে এই প্রাণীগুলো আবারও ফিরে আসতে পারে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে পূর্বাচলের এই এলাকা যেন এক পরিবর্তনের সাক্ষী। একদিকে আধুনিক নগরায়ণ, অন্যদিকে হারিয়ে যাওয়া প্রাকৃতিক জীবন। কোলাব্যাঙের সেই একসময়কার সরব উপস্থিতি এখন কেবল স্মৃতি হয়ে রয়ে যাচ্ছে।
এই পরিবর্তন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, উন্নয়ন এবং পরিবেশ সংরক্ষণ একসঙ্গে না চললে প্রকৃতির অনেক ক্ষুদ্র কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ অংশ চিরতরে হারিয়ে যেতে পারে।