ঈদ আসে, ঈদ চলে যায়। কিন্তু নিজভূমি মিয়ানমারে ফেরার অপেক্ষায় থাকা লাখো রোহিঙ্গার জীবনে প্রত্যাবাসনের স্বপ্ন এখনো অধরাই রয়ে গেছে। আন্তর্জাতিক মহলের নানা আশ্বাস ও কূটনৈতিক আলোচনার পরও বাস্তব অগ্রগতি না থাকায় কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবিরগুলোতে বাড়ছে হতাশা ও ক্ষোভ।
বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ৭টায় উখিয়া ও টেকনাফের বিভিন্ন ক্যাম্পে পবিত্র ঈদুল আজহার জামাত অনুষ্ঠিত হয়। তবে অন্যান্য জায়গার মতো উৎসবের আমেজ এখানে ছিল না। ক্যাম্পজুড়ে ছিল অনিশ্চয়তা, কষ্ট আর দীর্ঘশ্বাসের আবহ। নয় বছর ধরে নিজ দেশ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে শরণার্থী জীবনে থাকা রোহিঙ্গাদের কাছে ঈদের আনন্দ এখন অনেকটাই ফিকে হয়ে গেছে।
ক্যাম্পের ভেতরে বড়দের চোখে ছিল হতাশা ও বেদনার ছাপ। তবে শিশুদের কেউ কেউ নাগরদোলায় চড়ে, খেলাধুলায় মেতে ওঠে ঈদের কিছুটা আনন্দ খুঁজে নেওয়ার চেষ্টা করেছে। সীমাহীন সংকটের মধ্যেও শিশুদের মাঝে ঈদের উচ্ছ্বাস কিছুটা দেখা গেছে।
রোহিঙ্গা শিবিরের বাসিন্দাদের আলোচনায় আবারও উঠে আসে অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের পূর্বের একটি বক্তব্য। গত বছর কুতুপালং ক্যাম্প সফরের সময় তিনি বলেছিলেন, আগামী ঈদ যেন তারা নিজ দেশে উদযাপন করতে পারেন—এমন প্রত্যাশা করেন তিনি। সেই বক্তব্যে অনেকে নতুন করে প্রত্যাবাসনের আশা করেছিলেন।
টেকনাফের লেদা ক্যাম্পের ডেভেলপমেন্ট কমিটির চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আলম বলেন, বহু আশ্বাস পেলেও বাস্তবে কোনো পরিবর্তন হয়নি। এতে শরণার্থীদের মধ্যে হতাশা বাড়ছে।
ক্যাম্পবাসীদের অভিযোগ, কোরবানির ঈদ এলেও গত কয়েক বছর ধরে তারা পর্যাপ্ত সহায়তা বা মাংস বিতরণ সুবিধা পাচ্ছেন না। নিজেদের দেশের স্মৃতি, পরিবার ও কোরবানির ঈদের আনন্দ তাদের মনে গভীর কষ্টের জন্ম দিচ্ছে।
কুতুপালং ক্যাম্পের বৃদ্ধ আবু তৈয়ব জানান, মিয়ানমারে থাকাকালে তারা কৃষিকাজ, ব্যবসা ও গবাদিপশুর খামার নিয়ে স্বাভাবিক জীবনযাপন করতেন। এখন শরণার্থী জীবনে ত্রাণের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
আরেক রোহিঙ্গা ছৈয়দ আলম বলেন, দেশে ফেরার স্বপ্ন পূরণ না হওয়ায় তারা মানসিকভাবে ভেঙে পড়ছেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গত ১৫ মাসে নতুন করে আরও প্রায় ১ লাখ ৪৪ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে নিবন্ধিত হয়েছে। বর্তমানে উখিয়া, টেকনাফ ও ভাসানচরসহ বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্রে ১৪ লাখের বেশি রোহিঙ্গা অবস্থান করছে।
সরকারের তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত ৮ লাখের বেশি রোহিঙ্গার তথ্য মিয়ানমারের কাছে পাঠানো হলেও প্রত্যাবাসনে দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি।
অন্যদিকে, শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার জানান, এবার অর্থ সংকটের কারণে কোরবানির পশু ও সহায়তা কমানো হয়েছে।
সব মিলিয়ে ঈদের দিনে রোহিঙ্গা শিবিরে আনন্দের চেয়ে বেশি ছিল অনিশ্চয়তা ও ফিরে যাওয়ার অপেক্ষার দীর্ঘশ্বাস।
কসমিক ডেস্ক