শ্রমিক সংগঠনের অভ্যন্তরীণ বিরোধ ও চাঁদা আদায়কে কেন্দ্র করে চাঁপাইনবাবগঞ্জে হঠাৎ করেই সব ধরনের বাস চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। শুক্রবার (২৪ এপ্রিল) সকাল থেকে দূরপাল্লা, আন্তঃজেলা এবং উপজেলা পর্যায়ের সব রুটে এই কর্মবিরতি শুরু করেন পরিবহন শ্রমিকরা। এতে করে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন সাধারণ যাত্রীরা।
পরিবহন সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, এই পরিস্থিতির পেছনে রয়েছে দুই শ্রমিক সংগঠনের মধ্যে দীর্ঘদিনের দ্বন্দ্ব। একটি হলো চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা ট্রাক ট্যাংকলরি ও কাভার্ডভ্যান শ্রমিক ইউনিয়ন এবং অন্যটি চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা মোটরশ্রমিক ইউনিয়ন। উভয় সংগঠনই বাস থেকে চাঁদা আদায় নিয়ে মুখোমুখি অবস্থানে রয়েছে।
শ্রমিকদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে নির্ধারিত নিয়মে একীভূতভাবে চাঁদা আদায় করা হলেও সম্প্রতি মোটরশ্রমিক ইউনিয়নের একটি পক্ষ আলাদাভাবে চাঁদা আদায় শুরু করে। বিশেষ করে শহরের হরিপুর এলাকায় পৃথকভাবে চাঁদা আদায়কে কেন্দ্র করে বিরোধ তীব্র আকার ধারণ করে। এর প্রতিবাদেই শ্রমিকরা অনির্দিষ্টকালের জন্য কর্মবিরতি ঘোষণা করেছেন।
জেলা ট্রাক, ট্যাংকলরি ও কাভার্ডভ্যান শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক আনারুল ইসলাম আনার জানান, সড়কে বা টার্মিনালের বাইরে কোনো সংগঠনের চাঁদা আদায়ের এখতিয়ার নেই। এই অনিয়ম বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত তাদের কর্মবিরতি চলবে বলে তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন।
অন্যদিকে, মোটরশ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রউফ জুলমত দাবি করেন, তারা নিয়ম মেনেই বাস থেকে চাঁদা আদায় করছেন। তার অভিযোগ, অপর সংগঠনটি ট্রাক ও কাভার্ডভ্যানের পাশাপাশি বাস থেকেও চাঁদা আদায় করছে, যা তাদের এখতিয়ারের বাইরে।
পরিস্থিতি আরও জটিল আকার নেয় যখন মোটরশ্রমিক ইউনিয়নের পক্ষ থেকে হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়—চাঁদা আদায় বন্ধ না হলে সন্ধ্যার পর থেকে শুধু বাস নয়, ট্রাকসহ সব ধরনের পরিবহন বন্ধ করে দেওয়া হবে। এতে করে জেলায় পরিবহন ব্যবস্থা পুরোপুরি স্থবির হয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
এদিকে প্রশাসন বিষয়টি সমাধানের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এএনএম ওয়াসিম ফিরোজ জানান, দুই পক্ষকে নিয়ে বৈঠক করা হলেও এখনো কোনো সমঝোতায় পৌঁছানো যায়নি। তিনি বলেন, সড়কে কোনো ধরনের চাঁদাবাজি করা যাবে না—এ বিষয়ে উভয় পক্ষকেই সতর্ক করা হয়েছে।
হঠাৎ করে বাস চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ যাত্রীরা। যারা দূর-দূরান্তে যাওয়ার জন্য বাস টার্মিনালে এসেছিলেন, তারা পড়েছেন বিপাকে। অনেকেই বাধ্য হয়ে বিকল্প যানবাহন ব্যবহার করছেন, যেখানে ভাড়া কয়েকগুণ বেশি গুনতে হচ্ছে।
কিছু যাত্রী দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও কোনো সমাধান না পেয়ে বাড়ি ফিরে যেতে বাধ্য হয়েছেন। এতে করে শিক্ষার্থী, চাকরিজীবী এবং জরুরি কাজে যাতায়াতকারী মানুষদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, পরিবহন খাতে এ ধরনের দ্বন্দ্ব শুধু যাত্রীদের ভোগান্তি বাড়ায় না, বরং স্থানীয় অর্থনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। দ্রুত এই সমস্যার সমাধান না হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।
সব মিলিয়ে, চাঁপাইনবাবগঞ্জের বর্তমান পরিবহন সংকট শ্রমিক সংগঠনগুলোর বিরোধের একটি স্পষ্ট প্রতিফলন। এখন প্রশাসনের হস্তক্ষেপ ও সমঝোতার মাধ্যমেই এই অচলাবস্থা কাটবে—এমনটাই প্রত্যাশা সংশ্লিষ্টদের।
কসমিক ডেস্ক