বাংলাদেশের ইতিহাসে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তা ধরে রাখার আহ্বান জানিয়েছেন সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক আবু সাঈদ খান। তিনি বলেন, জাতির অস্তিত্ব, স্বাধীনতা এবং রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের মূল ভিত্তি এই মুক্তিযুদ্ধ, যা বাংলাদেশের হাজার বছরের ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হওয়া উচিত।
শুক্রবার (১৭ এপ্রিল) বিকেলে নাগরিক প্রতিনিধি দলের ব্যানারে মুজিবনগর স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা নিবেদন এবং মুজিবনগর কমপ্লেক্স পরিদর্শন শেষে তিনি এসব কথা বলেন। এ সময় তার সঙ্গে বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও নাগরিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
আবু সাঈদ খান তার বক্তব্যে স্পষ্টভাবে বলেন, “আমাদের একটাই মত এবং একটাই বিশ্বাস—সেটি হলো ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ। আমরা একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের অনুসারী। এই যুদ্ধের মধ্য দিয়েই আমরা আমাদের স্বাধীনতা, জাতীয় পতাকা এবং ভৌগোলিক মানচিত্র পেয়েছি।”
তিনি আরও উল্লেখ করেন, মুক্তিযুদ্ধ কোনো একক দল বা নির্দিষ্ট রাজনৈতিক মতাদর্শের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। বরং এটি ছিল সর্বস্তরের মানুষের অংশগ্রহণে একটি সর্বজনীন জনযুদ্ধ। এই ঐক্যবদ্ধ চেতনা এবং সম্মিলিত সংগ্রামই বাংলাদেশকে স্বাধীনতার পথে এগিয়ে নিয়ে গেছে।
আগামী প্রজন্মের জন্য এই ইতিহাস ও চেতনা ধরে রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, নতুন প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক দিকনির্দেশনা দিতে হবে। শুধু পাঠ্যপুস্তকের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচিহ্ন, স্মৃতিসৌধ এবং ঐতিহাসিক স্থানগুলোর মাধ্যমে এই চেতনা ছড়িয়ে দিতে হবে।
তিনি আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, ১৭ এপ্রিল অস্থায়ী সরকারের শপথ গ্রহণের দিন হলেও এদিনে রাষ্ট্রীয়ভাবে কোনো বড় কর্মসূচি দেখা যায়নি, যা হতাশাজনক। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী সরকারের কাছ থেকে এ বিষয়ে আরও দায়িত্বশীল ভূমিকা প্রত্যাশা করেন তিনি।
আবু সাঈদ খান আরও বলেন, “মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ধারাবাহিকতায় পরবর্তী সময়েও দেশের গুরুত্বপূর্ণ আন্দোলনগুলো সংঘটিত হয়েছে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে কিছু ব্যক্তি ছদ্মবেশে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচিহ্নে হামলা চালিয়েছে, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।”
তিনি অভিযোগ করেন, এ ধরনের ঘটনার বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃশ্যমান উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। ফলে দোষীদের বিচারের আওতায় আনার দাবি জোরালোভাবে তুলে ধরেন তিনি।
সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচিহ্নগুলো সংরক্ষণ করতে হবে এবং যেগুলো ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সেগুলো পুনর্নির্মাণ করতে হবে। পাশাপাশি যারা এসব ধ্বংসযজ্ঞের সঙ্গে জড়িত, তাদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে বিচার নিশ্চিত করতে হবে।
এ সময় উপস্থিত অন্যান্য বক্তারাও একই ধরনের মত প্রকাশ করেন। তাদের মতে, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও স্মৃতিচিহ্ন রক্ষা করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব এবং এটি অবহেলা করার কোনো সুযোগ নেই।
উল্লেখ্য, এর আগে একই দিনে সকালে ঐতিহাসিক মুজিবনগর দিবস উপলক্ষে স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা এবং মুক্তিযোদ্ধা সন্তান কমান্ড কাউন্সিলের সদস্যরা স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। তবে সরকারি উদ্যোগের অভাব নিয়ে তাদের মধ্যেও অসন্তোষ দেখা যায়।
সব মিলিয়ে, অনুষ্ঠানে বক্তারা একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারণ করে জাতীয় ঐক্য বজায় রাখার পাশাপাশি ইতিহাস সংরক্ষণে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।