বৈশ্বিক অস্থিরতা ও ক্রমবর্ধমান ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যে চীন-রাশিয়া সম্পর্ককে ‘আরও মূল্যবান’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। বেইজিংয়ে রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভের সঙ্গে এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে তিনি এই মন্তব্য করেন এবং দুই দেশের কৌশলগত অংশীদারত্ব আরও জোরদারের আহ্বান জানান।
বুধবার অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে শি জিনপিং বলেন, বর্তমান আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি পরিবর্তন ও অনিশ্চয়তায় পরিপূর্ণ হলেও চীন ও রাশিয়ার সম্পর্ক স্থিতিশীলভাবে এগিয়ে যাচ্ছে। তিনি মনে করেন, এই সম্পর্ক শুধু দুই দেশের স্বার্থ রক্ষার জন্যই নয়, বরং বৈশ্বিক ভারসাম্যের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।
চীনা প্রেসিডেন্ট আরও জানান, তার ও রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের মধ্যে পূর্বে হওয়া সমঝোতাগুলো বাস্তবায়নে দুই দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে আরও সক্রিয়ভাবে কাজ করতে হবে। পাশাপাশি কৌশলগত যোগাযোগ ও কূটনৈতিক সমন্বয় বাড়ানোর ওপর তিনি জোর দেন, যাতে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক আরও গভীর ও স্থিতিশীল হয়।
চীন ও রাশিয়ার মধ্যে এই সম্পর্ককে বিশ্লেষকরা দীর্ঘদিন ধরে ‘কৌশলগত অংশীদারত্ব’ হিসেবে বিবেচনা করে আসছেন। বিশেষ করে ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার সামরিক অভিযান শুরুর পর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার মুখে মস্কো বেইজিংয়ের সঙ্গে সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ করে তোলে।
এরপর থেকে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য, জ্বালানি, প্রযুক্তি ও সামরিক সহযোগিতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। পশ্চিমা বিশ্বের চাপের মধ্যেও চীন রাশিয়ার প্রতি তুলনামূলকভাবে কূটনৈতিক ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান বজায় রেখেছে।
সাম্প্রতিক সময়ে রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভ চীনে দুই দিনের সরকারি সফরে যান। সফরে তিনি চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ইয়ের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক ছাড়াও ইউক্রেন যুদ্ধ এবং মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকট, বিশেষ করে ইরান ইস্যু নিয়েও আলোচনা করেন।
বিশ্লেষকদের মতে, এই বৈঠক এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হলো যখন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি, ইরান-যুক্তরাষ্ট্র বিরোধ এবং ইউরোপে চলমান নিরাপত্তা সংকট বিশ্ব রাজনীতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
চীন-রাশিয়া সম্পর্ককে শি জিনপিং ‘বিশেষভাবে মূল্যবান’ বলার মাধ্যমে মূলত দুই দেশের পারস্পরিক নির্ভরশীলতা এবং কৌশলগত ঐক্যের বার্তা দিয়েছেন বলে মনে করা হচ্ছে। যদিও তিনি সরাসরি কোনো নির্দিষ্ট সংকট বা দেশের নাম উল্লেখ করেননি, তবে তার বক্তব্য বৈশ্বিক ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়ে একটি পরোক্ষ ইঙ্গিত বহন করে।
এর আগে গত সেপ্টেম্বরে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন চীন সফরে গেলে তাকে ‘পুরনো বন্ধু’ হিসেবে অভিহিত করেন শি জিনপিং। একইভাবে পুতিনও শি জিনপিংকে ‘প্রিয় বন্ধু’ হিসেবে সম্বোধন করেন, যা দুই দেশের ব্যক্তিগত ও কূটনৈতিক সম্পর্কের গভীরতা তুলে ধরে।
বর্তমান বৈঠককে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা চীন-রাশিয়ার দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত সহযোগিতার আরও একটি ধাপ হিসেবে দেখছেন। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দুই দেশের সম্পর্কের টানাপোড়েনের প্রেক্ষাপটে এই ঘনিষ্ঠতা বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি করছে।
সব মিলিয়ে, শি জিনপিংয়ের এই মন্তব্য চীন-রাশিয়া সম্পর্ককে শুধু কূটনৈতিক অংশীদারত্ব নয়, বরং বৈশ্বিক রাজনৈতিক কাঠামোর একটি গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসেবে আরও সুসংহত করার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
কসমিক ডেস্ক