মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে তৈরি হওয়া অস্থিরতার সরাসরি প্রভাব এখন বাংলাদেশেও স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে। দেশে তেলের বাজারে কৃত্রিম সংকটের কথা সরকার বললেও বাস্তবে বিভিন্ন এলাকায় চাহিদা অনুযায়ী জ্বালানি পাওয়া যাচ্ছে না। এর ফলে শিল্প, কৃষি, পরিবহন ও মৎস্য খাত—সবখানেই এক ধরনের চতুর্মুখী চাপ তৈরি হয়েছে।
সবচেয়ে বড় ধাক্কা লেগেছে দেশের প্রধান রপ্তানি খাত পোশাক শিল্পে। যেসব কারখানা উৎপাদনের জন্য জ্বালানি তেলের ওপর নির্ভরশীল, তারা চাহিদার তুলনায় অর্ধেক বা তারও কম তেল পাচ্ছে। অনেক কারখানা আবার একেবারেই তেল পাচ্ছে না। এতে উৎপাদন কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে এবং রপ্তানি কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
পোশাক খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের ওপর বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। শিল্প মালিকরা ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে প্রয়োজনীয় জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।
অন্যদিকে, জ্বালানি সংকটের প্রভাব পড়েছে কৃষি খাতেও। বিশেষ করে বোরো মৌসুমে সেচের জন্য ডিজেলের ওপর নির্ভরশীল কৃষকেরা চরম দুশ্চিন্তায় পড়েছেন। অনেক এলাকায় পেট্রলপাম্পে জ্বালানি না থাকায় সেচ কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। ফলে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি ফলন কমে যাওয়ার শঙ্কাও তৈরি হয়েছে।
কৃষকদের অভিযোগ, খোলাবাজারে তেল পাওয়া গেলেও তা অনেক বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। এতে লাভের বদলে লোকসানের আশঙ্কা করছেন তারা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সংকট অব্যাহত থাকলে খাদ্য উৎপাদনেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
পরিবহন খাতেও দেখা দিয়েছে বড় ধরনের প্রভাব। জ্বালানি সংকটের কারণে ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যানের সংখ্যা কমে গেছে, কারণ আগের মতো একবারে পর্যাপ্ত তেল পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে একই ট্রিপ শেষ করতে বেশি সময় লাগছে। এর প্রভাব সরাসরি পড়েছে ভাড়া বৃদ্ধিতে।
পরিবহন সংশ্লিষ্টরা জানান, আগে যেখানে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে গাজীপুর পর্যন্ত একটি ট্রিপে ভাড়া ছিল প্রায় ২০ হাজার টাকা, এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩০ হাজার টাকায়। এতে পণ্য পরিবহনের খরচ বেড়ে গিয়ে বাজারে পণ্যের দামও বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
এদিকে মৎস্য খাতও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সমুদ্রগামী মাছ ধরার জাহাজগুলো পর্যাপ্ত জ্বালানি না পাওয়ায় অনেকেই সমুদ্রে যেতে পারছে না। এতে জেলেরা আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন। বড় জাহাজ পরিচালনায় দৈনিক কয়েক লাখ টাকা খরচ হয়, যার বড় অংশই জ্বালানি খরচ।
জ্বালানি সংকটের কারণে অনেক জাহাজ মালিক ও শ্রমিকের আয় বন্ধ হয়ে গেছে, এমনকি বেতন-ভাতাও আটকে যাচ্ছে। ফলে এই খাতে অনিশ্চয়তা আরও বেড়েছে।
সব মিলিয়ে জ্বালানি সংকট দেশের অর্থনীতির বিভিন্ন স্তরে একযোগে চাপ সৃষ্টি করছে। শিল্প উৎপাদন, কৃষি উৎপাদন, পরিবহন ব্যয় এবং মৎস্য আহরণ—সবখানেই নেতিবাচক প্রভাব পড়ায় সামগ্রিক অর্থনীতি ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই সংকট মোকাবেলায় দ্রুত বিকল্প জ্বালানি উৎস নিশ্চিত করা, সরবরাহ ব্যবস্থাপনা উন্নত করা এবং বাজারে কঠোর নজরদারি বাড়ানো জরুরি। অন্যথায় এই চতুর্মুখী চাপ আরও তীব্র হয়ে দেশের অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।
কসমিক ডেস্ক