প্রযুক্তি খাতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে বড় ধরনের পরিবর্তনের পথে হাঁটছে ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামের মূল প্রতিষ্ঠান মেটা। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কোম্পানিটি আবারও বড় পরিসরে কর্মী ছাঁটাইয়ের পরিকল্পনা করছে। সম্ভাব্য এই ছাঁটাইয়ের পরিমাণ মেটার মোট কর্মীর প্রায় ২০ শতাংশ বা তারও বেশি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বর্তমানে মেটাতে প্রায় ৭৯ হাজার কর্মী কাজ করছেন। সেই হিসাব অনুযায়ী, যদি পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হয়, তাহলে প্রায় ১৬ হাজার কর্মী চাকরি হারাতে পারেন। তবে এ বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা হয়নি।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, মেটা বর্তমানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তির উন্নয়নে বিপুল বিনিয়োগের পরিকল্পনা করছে। কোম্পানিটি ২০২৮ সালের মধ্যে এআই খাতে প্রায় ৬০০ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। এই বিশাল ব্যয়ের চাপ সামাল দিতেই খরচ কমানোর নানা উপায় খুঁজছে প্রতিষ্ঠানটি, যার একটি হতে পারে কর্মীসংখ্যা কমানো।
মেটার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মার্ক জুকারবার্গ মনে করেন, প্রযুক্তির অগ্রগতির কারণে অনেক কাজ এখন আগের তুলনায় কম জনবল দিয়েই করা সম্ভব। তার মতে, আগে যে ধরনের কাজ সম্পন্ন করতে বড় আকারের টিম প্রয়োজন হতো, এখন উন্নত এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে একজন দক্ষ কর্মীই সেই কাজ সম্পন্ন করতে পারছেন।
এই ধারণা থেকেই কোম্পানিকে আরও ছোট ও কার্যকর কাঠামোয় নিয়ে যেতে চান জুকারবার্গ। তার দৃষ্টিতে, কম সংখ্যক কিন্তু দক্ষ কর্মী নিয়ে একটি সংগঠন পরিচালনা করলে সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও কাজের গতি আরও বাড়তে পারে।
তবে সম্ভাব্য ছাঁটাইয়ের খবর নিয়ে মেটার পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত কিছু বলা হয়নি। কোম্পানির মুখপাত্র অ্যান্ডি স্টোন এই বিষয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেছেন, প্রকাশিত তথ্যগুলো অনুমাননির্ভর। যদিও তিনি স্বীকার করেছেন যে কোম্পানির বিভিন্ন বিভাগকে খরচ কমানোর পরিকল্পনা নিয়ে ভাবতে বলা হয়েছে।
মেটার জন্য কর্মী ছাঁটাই নতুন ঘটনা নয়। এর আগেও প্রতিষ্ঠানটি একাধিক দফায় কর্মী কমিয়েছে। বিশেষ করে ২০২২ এবং ২০২৩ সালে কোম্পানিটি বড় পরিসরে ছাঁটাই কার্যক্রম পরিচালনা করে। ওই সময় মোট প্রায় ২১ হাজার কর্মীকে বিদায় নিতে হয়েছিল।
প্রযুক্তি খাতের অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত উন্নয়ন প্রযুক্তি শিল্পের কর্মসংস্থানের ধরণ বদলে দিচ্ছে। বড় বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এখন অনেক ক্ষেত্রে মানুষের পরিবর্তে স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি ব্যবহারের দিকে ঝুঁকছে।
শুধু মেটাই নয়, অন্যান্য প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানেও একই ধরনের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, এআই প্রযুক্তির অগ্রগতিকে সামনে রেখে অনলাইন বাণিজ্য প্রতিষ্ঠান অ্যামাজনও প্রায় ১৬ হাজার কর্মী ছাঁটাইয়ের ঘোষণা দিয়েছে। একইভাবে ফিনটেক কোম্পানি ব্লক তাদের মোট কর্মীর প্রায় অর্ধেক ছাঁটাইয়ের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে।
এই পরিবর্তন প্রযুক্তি খাতের ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থান নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে। অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করছেন, এআই প্রযুক্তির প্রসার কর্মসংস্থানের ধরন পাল্টে দিতে পারে এবং ভবিষ্যতে দক্ষতা ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতার ওপর আরও বেশি গুরুত্ব দেওয়া হবে।
তবে অন্যদিকে অনেকের মতে, এআই প্রযুক্তি যেমন কিছু চাকরি কমিয়ে দিতে পারে, তেমনি নতুন ধরনের কাজের সুযোগও তৈরি করতে পারে। প্রযুক্তির পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে দক্ষতা বাড়াতে পারলে ভবিষ্যতের কর্মবাজারে নতুন সম্ভাবনাও তৈরি হতে পারে।
সব মিলিয়ে, মেটার সম্ভাব্য এই কর্মী ছাঁটাই পরিকল্পনা প্রযুক্তি শিল্পে চলমান বড় পরিবর্তনের একটি উদাহরণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এআই প্রযুক্তিকে কেন্দ্র করে প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো তাদের কাঠামো নতুনভাবে সাজানোর চেষ্টা করছে, যার প্রভাব কর্মসংস্থানেও পড়তে শুরু করেছে।
কসমিক ডেস্ক