নেত্রকোনা জেলা শহরে দিন দিন তীব্র আকার ধারণ করছে যানজটের সমস্যা। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও মোড়ে দীর্ঘ সময় ধরে যানবাহনের জট লেগে থাকতে দেখা যায়। বিশেষ করে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়া, ফুটপাত দখল এবং সড়ক ব্যবস্থাপনায় নানা ধরনের অব্যবস্থাপনার কারণে শহরের স্বাভাবিক যান চলাচল প্রায়ই বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এতে করে পথচারী, শিক্ষার্থী এবং কর্মজীবী মানুষকে প্রতিনিয়ত ভোগান্তির মুখে পড়তে হচ্ছে।
পৌরসভার তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে নেত্রকোনা পৌর এলাকায় নিবন্ধিত ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার সংখ্যা ২ হাজার ৪৫০টি। এছাড়াও শহরে ১ হাজার ৩০৮টি ব্যাটারিচালিত রিকশা এবং ১ হাজার ৯০১টি প্যাডেলচালিত রিকশা রয়েছে। তবে বাস্তবে এর বাইরেও অনেক অটোরিকশা শহরের সড়কে চলাচল করছে বলে দেখা যায়। অনেক ক্ষেত্রে নকল নম্বর ব্যবহার করে বা কোনো অনুমতি ছাড়াই এসব যানবাহন চলাচল করছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে প্রকৃত সংখ্যা সরকারি হিসাবের তুলনায় অনেক বেশি বলে ধারণা করা হচ্ছে।
শহরের মোক্তারপাড়া, কুরপাড়, মেছুয়া বাজার, তেরীবাজার, সাতপাই, ছোটবাজার, নিউটাউন, কলেজ মোড়, মালনী এবং হাসপাতাল মোড় এলাকায় প্রায় প্রতিদিনই তীব্র যানজটের চিত্র দেখা যায়। এসব স্থানে সড়কের বড় অংশ দখল করে সারি বেঁধে দাঁড়িয়ে থাকে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা। যাত্রী ওঠানামার জন্য মাঝরাস্তায় থামানো, উল্টো পথে চলাচল এবং নির্দিষ্ট স্ট্যান্ডের অভাবে অল্প সময়ের মধ্যেই দীর্ঘ যানজট সৃষ্টি হয়। অনেক সময় এসব কারণে দুর্ঘটনার ঘটনাও ঘটছে।
এছাড়া শহরের বিভিন্ন সড়কের ফুটপাতের বড় অংশ দখল করে বসেছে ভ্রাম্যমাণ দোকান ও অস্থায়ী ব্যবসায়ীরা। ফলে পথচারীদের নিরাপদভাবে হাঁটার জায়গা সংকুচিত হয়ে পড়েছে। বাধ্য হয়ে অনেকেই সড়কের ওপর দিয়েই চলাচল করেন। এতে যানবাহনের গতি আরও ধীর হয়ে যায় এবং যানজটের পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে।
স্থানীয়দের মতে, কয়েক বছর আগেও শহরে এত ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ছিল না। কিন্তু সহজ কিস্তি সুবিধা এবং দ্রুত আয়ের সম্ভাবনার কারণে অনেকেই এই পেশায় যুক্ত হয়েছেন। ফলে অল্প সময়ের মধ্যেই এসব যানবাহনের সংখ্যা কয়েকগুণ বেড়ে গেছে।
শহরের মালনী এলাকার বাসিন্দা শামসুল হক বলেন, আগে শহরে অটোরিকশার সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম ছিল। বর্তমানে প্রায় প্রতিটি সড়কেই অসংখ্য অটোরিকশা দেখা যায়। সরু সড়কে এত যানবাহন চলাচলের কারণে যানজট এখন প্রায় প্রতিদিনের ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এদিকে অনেক ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার চালকেরই বৈধ লাইসেন্স বা প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ নেই বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে অনেক চালক ট্রাফিক আইন সম্পর্কে যথাযথ ধারণা রাখেন না। গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে ট্রাফিক সিগন্যাল অমান্য করা, যত্রতত্র যাত্রী ওঠানামা করানো এবং বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালানোর কারণে দ্রুত যানজট তৈরি হচ্ছে।
নেত্রকোনা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী তানভীর হাসান বলেন, শহরের বেশিরভাগ অটোরিকশারই বৈধ লাইসেন্স নেই এবং অনেক চালক ট্রাফিক নিয়ম মানেন না। এতে করে গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলোতে প্রায়ই যানজট সৃষ্টি হয়।
অন্যদিকে শহরের হিরণপুর এলাকার এক অটোরিকশাচালক শামিম জানান, অনেকেই আগে বেকার ছিলেন। অটোরিকশা চালিয়ে এখন তারা কিছু আয় করতে পারছেন। তবে শহরে অটোরিকশার সংখ্যা বেশি হয়ে যাওয়ায় ঠিকমতো যাত্রী পাওয়া যায় না। আবার অনেক সময় পুলিশ ধরলে জরিমানাও দিতে হয়।
এদিকে ঈদকে সামনে রেখে শহরের বাজার ও বিপণিবিতানগুলোতে ধীরে ধীরে মানুষের ভিড় বাড়ছে। ঈদের কেনাকাটা শুরু হওয়ায় বাজার এলাকায় যানবাহনের চাপও বৃদ্ধি পাচ্ছে। যদিও এখনও পুরোপুরি ঘরমুখো মানুষের চলাচল শুরু হয়নি। তবে ঈদের ছুটিতে জেলার বাইরে থেকে মানুষ বাড়ি ফিরতে শুরু করলে এবং কেনাকাটার চাপ বাড়লে শহরের যানজট পরিস্থিতি আরও তীব্র হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
পরিবহন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, স্বল্প দূরত্বে যাতায়াতের জন্য ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা একটি সাশ্রয়ী মাধ্যম। তবে সঠিক পরিকল্পনা ও নিয়ন্ত্রণ ছাড়া এসব যানবাহনের সংখ্যা বাড়তে থাকলে শহরের ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা আরও চাপের মুখে পড়তে পারে।
নেত্রকোনা সদর পুলিশ পরিদর্শক (শহর ও যানবাহন) মাহবুবুর রহমান জানান, শহরের যানজট নিয়ন্ত্রণে ট্রাফিক পুলিশ নিয়মিত কাজ করছে। তবে অটোরিকশার সংখ্যা বেশি হওয়ায় অনেক সময় পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। ঈদকে সামনে রেখে যাত্রীদের ভোগান্তি কমাতে অতিরিক্ত ট্রাফিক পুলিশ মোতায়েনের পরিকল্পনা রয়েছে।
অন্যদিকে নেত্রকোনা পৌরসভার প্রশাসক মো. আরিফুল ইসলাম সরদার জানিয়েছেন, পৌর এলাকায় অবৈধ যানবাহন নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। পাশাপাশি ফুটপাত দখলমুক্ত রাখতেও অভিযান চলছে। ঈদকে সামনে রেখে যাত্রীদের ভোগান্তি কমাতে আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানান তিনি।
কসমিক ডেস্ক