দিনাজপুরের বোচাগঞ্জ উপজেলায় আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি ব্যবহার করে ফুলকপি ও বাঁধাকপি চাষে সাফল্যের নজির স্থাপন করেছেন তিনজন কৃষক। উত্তম কৃষি চর্চা বা জিএপি (গুড অ্যাগ্রিকালচারাল প্র্যাকটিস) পদ্ধতিতে ক্লাস্টারভিত্তিক চাষাবাদ করে তারা ভালো ফলন ও আর্থিক লাভের মুখ দেখছেন। স্থানীয় কৃষকদের জন্য এই উদ্যোগ এখন একটি অনুপ্রেরণামূলক উদাহরণ হয়ে উঠেছে।
উপজেলার ৬ নম্বর রনগাঁও ইউনিয়নের হাটরামপুর (পাবনাপাড়া) গ্রামে ‘হাটরামপুর (পাবনাপাড়া) পার্টনার ফিল্ড স্কুল (জিএপি)’ উদ্যোগের আওতায় এই ক্লাস্টারভিত্তিক কপি চাষের প্রদর্শনী স্থাপন করা হয়। প্রকল্পটির লক্ষ্য হলো নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি এবং আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে কৃষকদের আয় বাড়ানো।
২০২৫ সালের ২২ নভেম্বর প্রায় ১০ হেক্টর জমিতে ফুলকপি ও বাঁধাকপির চারা রোপণের মাধ্যমে এ কার্যক্রম শুরু হয়। পরিকল্পিতভাবে জমি প্রস্তুত, মানসম্মত চারা ব্যবহার, নিয়মিত পরিচর্যা এবং আধুনিক কৃষি ব্যবস্থাপনার কারণে শুরু থেকেই ক্ষেতগুলোতে কপির ভালো বৃদ্ধি দেখা যায়।
এই প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণ করেন তিনজন কৃষক—মো. জামাল ইসলাম, বিপ্লব রায় এবং মোমিনুল ইসলাম। তারা কৃষি বিভাগের নির্দেশনা মেনে একসঙ্গে ক্লাস্টার পদ্ধতিতে চাষাবাদ শুরু করেন। জমিতে এক্সেল সুপার, এটলাস-৭০, এটলাস-৭৫ এবং এটম জাতের ফুলকপি ও বাঁধাকপি চাষ করা হয়েছে, যা ফলন ও বাজারদরের দিক থেকে ভালো হিসেবে পরিচিত।
চাষের শুরু থেকে নিয়মিত সেচ, সার প্রয়োগ, রোগবালাই দমনসহ প্রয়োজনীয় সব ধরনের পরিচর্যা করা হয়। এর ফলে কপির গাছগুলো সুস্থভাবে বেড়ে ওঠে এবং প্রত্যাশার তুলনায় ভালো ফলন দেয়। বর্তমানে ক্ষেত থেকে কপি সংগ্রহ করে স্থানীয় বাজারে বিক্রি করছেন কৃষকরা।
কৃষকদের দেওয়া তথ্যমতে, এই ক্লাস্টারভিত্তিক কপি চাষে মোট প্রায় তিন লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে। ইতোমধ্যে তারা প্রায় ছয় লাখ টাকার কপি বিক্রি করেছেন। ভালো ফলন ও বাজারে চাহিদা থাকায় সামনে আরও বেশি লাভের আশা করছেন তারা।
কৃষক জামাল ইসলাম জানান, আগে প্রচলিত পদ্ধতিতে চাষ করলেও এবার কৃষি অফিসের পরামর্শে আধুনিক পদ্ধতি অনুসরণ করেছেন। এতে খরচ কিছুটা বেশি হলেও ফলন ভালো হওয়ায় লাভের পরিমাণও বেড়েছে। তিনি বলেন, একই সঙ্গে কয়েকজন কৃষক মিলে ক্লাস্টার পদ্ধতিতে চাষ করায় কাজও সহজ হয়েছে এবং উৎপাদনও ভালো হয়েছে।
বিপ্লব রায় বলেন, কৃষি বিভাগের পরামর্শ অনুযায়ী জমি প্রস্তুত ও পরিচর্যা করায় রোগবালাই কম হয়েছে। ফলে কপির আকার বড় হয়েছে এবং বাজারে ভালো দাম পাওয়া যাচ্ছে। তিনি মনে করেন, এভাবে পরিকল্পিতভাবে চাষ করলে কৃষকরা সহজেই লাভবান হতে পারেন।
এদিকে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, “প্রোগ্রাম অন অ্যাগ্রিকালচারাল অ্যান্ড রুরাল ট্রান্সফরমেশন ফর নিউট্রিশন, এন্টারপ্রেনারশিপ অ্যান্ড রেসিলিয়েন্স ইন বাংলাদেশ (পার্টনার)” প্রকল্পের আওতায় ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এ ক্লাস্টার প্রদর্শনী বাস্তবায়ন করা হয়েছে। এর মূল উদ্দেশ্য হলো নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি এবং কৃষকদের আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির সঙ্গে পরিচিত করা।
বোচাগঞ্জ উপজেলা কৃষি অফিসার কৃষিবিদ নয়ন কুমার সাহা বলেন, উত্তম কৃষি চর্চা বা জিএপি পদ্ধতি অনুসরণ করলে নিরাপদ ও মানসম্মত খাদ্য উৎপাদন সম্ভব হয়। একই সঙ্গে কৃষকদের উৎপাদন খরচ কমিয়ে লাভ বাড়ানো যায়।
তিনি আরও বলেন, এ ধরনের ক্লাস্টারভিত্তিক প্রদর্শনী কৃষকদের মধ্যে আধুনিক প্রযুক্তি ছড়িয়ে দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এতে আশপাশের কৃষকরাও নতুন পদ্ধতিতে চাষাবাদে আগ্রহী হচ্ছেন।
স্থানীয় কৃষকদের মতে, একসঙ্গে পরিকল্পিতভাবে চাষাবাদ করার ফলে বাজার ব্যবস্থাপনাও সহজ হয় এবং উৎপাদিত পণ্য দ্রুত বিক্রি করা সম্ভব হয়। তাই তারা ভবিষ্যতেও এ ধরনের ক্লাস্টার পদ্ধতিতে বিভিন্ন ফসল চাষ করার পরিকল্পনা করছেন।
সামগ্রিকভাবে বোচাগঞ্জের এই উদ্যোগ প্রমাণ করছে যে, আধুনিক প্রযুক্তি ও সঠিক ব্যবস্থাপনা ব্যবহার করলে কৃষিতে সাফল্য পাওয়া সম্ভব। একই সঙ্গে এটি অন্য কৃষকদের জন্যও একটি কার্যকর মডেল হিসেবে কাজ করতে পারে।
কসমিক ডেস্ক