দীর্ঘ চার বছর স্থবির থাকার পর বাংলাদেশ-ভারত দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য আলোচনার দুয়ার আবার খুলতে যাচ্ছে। আজ সকালে সচিবালয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদিরের সঙ্গে বৈঠকে বসছেন ভারতের হাইকমিশনার প্রণব কুমার ভার্মা। সংশ্লিষ্ট মহলে এ বৈঠককে দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক পুনরুদ্ধারের গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সূত্র জানায়, দুই দেশের মধ্যে সর্বশেষ বাণিজ্য সচিব পর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছিল ২০২২ সালের ৪ মার্চ, ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লি-তে। রীতি অনুযায়ী পরবর্তী বৈঠক ঢাকায় হওয়ার কথা থাকলেও গত চার বছরে তা আর অনুষ্ঠিত হয়নি।
একইভাবে, দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য-সম্পর্কিত জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপ অন ট্রেড (জেডাব্লিউজিটি)-এর সর্বশেষ বৈঠক হয় ২০২৩ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর। এরপর বিভিন্ন সময়ে যোগাযোগ করা হলেও ভারতের পক্ষ থেকে সাড়া মেলেনি বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।
দুই দেশের মধ্যে কমপ্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপ অ্যাগ্রিমেন্ট (সেপা) নিয়েও আলোচনা গত দুই বছর ধরে স্থগিত রয়েছে। এছাড়া সীমান্তবর্তী এলাকায় চালু থাকা সাতটি বর্ডার হাটের কার্যক্রমও অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ রয়েছে।
পাল্টাপাল্টি নিষেধাজ্ঞার প্রভাব
২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলন-পরবর্তী রাজনৈতিক অস্থিরতা ও কূটনৈতিক দূরত্বের জেরে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যে টানাপোড়েন শুরু হয়। ওই সময়ের পর থেকে আমদানি-রপ্তানিতে পাল্টাপাল্টি নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়।
গত বছরের ৮ এপ্রিল ভারত তাদের বন্দর ব্যবহার করে তৃতীয় দেশে পণ্য রপ্তানির জন্য বাংলাদেশকে দেওয়া ট্রানশিপমেন্ট সুবিধা বাতিল করে। একই বছরের ১৭ মে ও ২৭ জুন স্থলবন্দর দিয়ে বাংলাদেশি তৈরি পোশাক, প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, প্লাস্টিক পণ্য, পাট ও পাটজাতপণ্যসহ বিভিন্ন পণ্যের আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা দেয় ভারতের ডিরেক্টর জেনারেল অব ফরেইন ট্রেড (ডিজিএফটি)।
বাংলাদেশের পক্ষ থেকেও কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়। ১৫ এপ্রিল স্থলবন্দর দিয়ে সুতা আমদানির সুবিধা বাতিল করা হয়। শুল্কমুক্ত চাল আমদানির অনুমতির মেয়াদ শেষ হলেও তা আর বাড়ানো হয়নি।
এসব সিদ্ধান্তের প্রভাব পড়ে রপ্তানি খাতে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি)-এর তথ্যানুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে (জুলাই-নভেম্বর) ভারতে বাংলাদেশের রপ্তানি কমেছে ৬ দশমিক ৬৮ শতাংশ। তৈরি পোশাক, প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্য এবং পাট ও পাটজাত পণ্যের রপ্তানিতে উল্লেখযোগ্য হ্রাস লক্ষ্য করা গেছে।
কূটনৈতিক টানাপোড়েন ও বাণিজ্য
২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কে শীতলতা নেমে আসে। বিশেষ করে শেখ হাসিনা-কে আশ্রয় দেওয়ার ইস্যুতে দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক দূরত্ব তৈরি হয়। এর প্রভাব পড়ে বাণিজ্যেও।
তবে নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর পরিস্থিতি কিছুটা বদলেছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এবার ভারত নিজ উদ্যোগেই আলোচনায় আগ্রহ দেখাচ্ছে, যা ইতিবাচক সংকেত।
বিশেষজ্ঞদের মতামত
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সাবেক অতিরিক্ত সচিব ও সুইস ফাউন্ডেশন ফর টেকনিক্যাল কো-অপারেশনের সিনিয়র অ্যাডভাইজার মনোজ কুমার রায় বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারি হওয়া বিধিনিষেধে উভয় দেশই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশ ও ভারত একে অপরের বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার। রাজনৈতিক কারণে এ সম্পর্ক বাধাগ্রস্ত হওয়া উচিত নয়।
তিনি মনে করেন, উন্নয়ন ও উৎপাদনের স্বার্থেই দুই দেশের একে অপরকে প্রয়োজন। তাই পাল্টাপাল্টি নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে বাণিজ্যিক সম্পর্ক আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা এখন অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।
সামনে কী?
আজকের বৈঠকে সেপা চুক্তি, ট্রানশিপমেন্ট সুবিধা পুনর্বহাল, বর্ডার হাট পুনরায় চালু, স্থলবন্দর বাণিজ্য স্বাভাবিক করা এবং নিত্যপণ্য আমদানির সমঝোতা স্মারকসহ একাধিক ইস্যু আলোচনায় আসতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই বৈঠক সফল হলে চার বছর ধরে জমে থাকা বাণিজ্যিক জট খুলতে শুরু করবে। দক্ষিণ এশিয়ার দুই বৃহৎ অর্থনীতির পারস্পরিক সহযোগিতা আঞ্চলিক অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
সার্বিকভাবে, দীর্ঘ স্থবিরতার পর ঢাকা-দিল্লি বাণিজ্য সম্পর্ক নতুন করে গতি পাবে কি না—তা নির্ভর করছে আজকের আলোচনার ফলাফলের ওপর।
কসমিক ডেস্ক