গত বছরের নভেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহে শ্রম আইন সংশোধন করে অধ্যাদেশ জারি করে সরকার। সংশোধনের মূল উদ্দেশ্য ছিল শ্রমিকদের সংগঠন গঠন সহজ করা, ট্রেড ইউনিয়নের নিবন্ধনে সম্মতির সংখ্যা কমানোসহ দীর্ঘদিনের কয়েকটি দাবি বাস্তবায়ন। শ্রমিক নেতারা এ উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে স্বাগত জানান। তবে আইন কার্যকর হওয়ার দুই মাস না যেতেই আবার সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়ায় নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় সম্প্রতি শ্রম আইন কোন কোন ধারা পুনরায় সংশোধন করা প্রয়োজন—তা নিয়ে আলোচনা করতে ত্রিপক্ষীয় পরামর্শ পরিষদ (টিসিসি)-এর সভা ডাকে। গতকাল বুধবার এ সভা হওয়ার কথা থাকলেও আগের দিন মঙ্গলবার হঠাৎ করে ‘অনিবার্য কারণ’ দেখিয়ে তা স্থগিত করা হয়। এ সিদ্ধান্ত নিয়েই শ্রমিক ও মালিকপক্ষের মধ্যে ভিন্ন প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।
সংশোধিত শ্রম আইনে ২০ জনের সম্মতিতে ট্রেড ইউনিয়ন গঠনের সুযোগসহ একাধিক শ্রমবান্ধব বিধান যুক্ত হওয়ায় শ্রমিকনেতারা একে অগ্রগতির ধাপ হিসেবে দেখছেন। তবে অধ্যাদেশ জারির পরপরই তৈরি পোশাক ও বস্ত্রখাতের মালিকদের তিনটি সংগঠন—বিজিএমইএ, বিকেএমইএ ও বিটিএমএ—এই সংশোধন আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যাখ্যান করে।
পরবর্তীতে বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশন (বিইএফ) সংশোধিত শ্রম আইনে ১৭টি অসংগতি চিহ্নিত করে সেগুলো সংশোধনের দাবি জানায়। মালিকপক্ষের অভিযোগ, টিসিসির বৈঠকে সর্বসম্মতিক্রমে যে সিদ্ধান্তগুলো নেওয়া হয়েছিল, সরকার সেগুলোর কয়েকটি থেকে সরে এসেছে। একই সঙ্গে অধ্যাদেশে আইনি ও বাস্তব প্রয়োগসংক্রান্ত অস্পষ্টতা রয়েছে বলেও দাবি করা হয়।
একাধিক শ্রমিকনেতা প্রথম আলোকে জানিয়েছেন, বাস্তবে এখন পর্যন্ত সংশোধিত শ্রম আইন কার্যকরে কোনো বড় ধরনের জটিলতা দেখা দেয়নি। তাঁদের মতে, মূলত মালিকপক্ষের চাপেই সরকার এত দ্রুত আইনটি আবার সংশোধনের পথে হাঁটছে। টিসিসির সভা হঠাৎ ডাকার পেছনেও এই চাপ কাজ করেছে বলে তাঁরা মনে করছেন।
অন্যদিকে মালিকপক্ষের নেতারা বলছেন, শ্রম আইন সংশোধনের সময় সরকার অংশীজনদের সঙ্গে যেসব সমঝোতায় পৌঁছেছিল, তা পুরোপুরি মানা হয়নি। এতে আইনটি বাস্তবায়নে শিল্পখাতে সমস্যা তৈরি হতে পারে। তাঁদের দাবি, এসব অসংগতি সংশোধন না করা হলে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়েও তাঁরা ভাবছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শ্রম আইন একটি সংবেদনশীল বিষয়, যেখানে শ্রমিক অধিকার, শিল্পের টেকসই উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড—সবকিছুই বিবেচনায় নিতে হয়। আইন কার্যকর হওয়ার এত অল্প সময়ের মধ্যেই পুনরায় সংশোধনের উদ্যোগ শ্রম নীতিনির্ধারণে স্থিরতার অভাবকেই তুলে ধরে।
এখন টিসিসির সভা কবে অনুষ্ঠিত হবে এবং শেষ পর্যন্ত শ্রম আইন কোন পথে এগোবে—সেদিকেই তাকিয়ে আছেন শ্রমিক, মালিক ও সংশ্লিষ্ট মহল।
কসমিক ডেস্ক