জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে দেশের নিরাপত্তা পরিস্থিতি ও বিচারহীনতা বড় উদ্বেগ হিসেবে উঠে এসেছে। সহিংসতা, প্রকাশ্য হত্যাকাণ্ডের বিচার না হওয়া এবং প্রার্থীদের নিরাপত্তাহীন চলাচল সুষ্ঠু নির্বাচনের পথে বড় বাধা সৃষ্টি করছে বলে মত দিয়েছেন রাজনৈতিক নেতা ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা। তাঁদের মতে, ত্যাগ ও রক্তের বিনিময়ে অর্জিত এই নির্বাচনকে অর্থবহ করতে হলে সহিংসতা পরিহার, ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত এবং জবাবদিহিমূলক গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া প্রতিষ্ঠা করাই এখন জাতির প্রধান দায়িত্ব। নির্বাচিত সরকার ছাড়া জবাবদিহি কার্যকর হয় না—এমন অভিমতও উঠে আসে আলোচনায়।
গতকাল রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে (বিসিএফসিসি) আয়োজিত এক সংলাপে এসব কথা বলেন বক্তারা। ‘নাগরিক ইশতেহার ২০২৬: জাতীয় নির্বাচন ও রূপান্তরের প্রত্যাশা’ শীর্ষক এই সংলাপের আয়োজন করে এসডিজি বাস্তবায়নে নাগরিক প্ল্যাটফর্ম, বাংলাদেশ। অনুষ্ঠানে নাগরিক ইশতেহারের খসড়া উপস্থাপন করেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য।
সংলাপে বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ভিন্নমতের মানুষ একসঙ্গে বসে মুক্তভাবে কথা বলতে পারছে—এমন পরিবেশ তৈরি হওয়াই গণতন্ত্রের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। তিনি বলেন, গণতন্ত্রে ফেরার পথে সিভিল সোসাইটির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং তাদের কাজ করার সুযোগ শুধু দেওয়া নয়, বরং সক্রিয়ভাবে সহায়তা করাও জরুরি। তাঁর ভাষায়, সুষ্ঠু নির্বাচন ছাড়া গণতন্ত্রে ফেরা সম্ভব নয় এবং নির্বাচিত সরকার ছাড়া সংসদীয় জবাবদিহি কার্যকর হয় না।
দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, শুধু নির্বাচন সুষ্ঠু হলেই হবে না, সেটি অর্থবহ হতে হবে। তিনি প্রশ্ন তোলেন, নির্বাচন কি বাস্তব কোনো পরিবর্তন আনবে, নাকি দেশ আবারও পুরোনো ধারাবাহিকতার মধ্যে প্রবেশ করবে? তাঁর মতে, গত দেড় দশকে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা, দুর্নীতি ও ক্ষমতার অতিরিক্ত কেন্দ্রীভবন নাগরিক পরিসর সংকুচিত করেছে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে সুষ্ঠু ও অর্থবহ নির্বাচন অপরিহার্য।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ড. রওনক জাহান বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর মনোনয়ন প্রক্রিয়ায় কতটা পরিবর্তন এসেছে, সেটি বড় প্রশ্ন। মাঠপর্যায়ের মতামতের ভিত্তিতে প্রার্থী নির্বাচন হচ্ছে কি না, তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। তাঁর মতে, এখনো মাসল পাওয়ার ও ব্যবসায়ীভিত্তিক প্রার্থীদের অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নেতা সাইফুল আলম খান মিলন বলেন, নির্বাচনী মাঠে প্রার্থীরা সারাক্ষণ আতঙ্কের মধ্যে চলাফেরা করছেন। ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ছাড়া স্বাভাবিক ধর্মীয় কার্যক্রমেও অংশ নেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। প্রকাশ্য দিবালোকে একজন প্রার্থীর হত্যাকাণ্ড এবং তার বিচার না হওয়াকে তিনি ভয়াবহ উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেন।
গণফোরামের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি সুব্রত চৌধুরী বলেন, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বারবার প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ হয়েছে। শুধু নির্বাচন দিয়ে পরিবর্তন সম্ভব নয়; প্রয়োজন অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্র, রাজনৈতিক সংস্কার ও জাতীয় ঐক্য।
সংলাপে আরও বক্তব্য দেন সিপিবির সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ আল ক্বাফী রতন, জাতীয় নাগরিক পার্টির যুগ্ম আহ্বায়ক নুসরাত তাবাসসুম, এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জুসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা। তাঁদের বক্তব্যে একটি বিষয়ই স্পষ্ট—নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সহিংসতা ও নিরাপত্তাহীনতা দূর না হলে গণতান্ত্রিক রূপান্তর ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা কঠিন হবে।
কসমিক ডেস্ক