দেশজুড়ে টানা বর্ষণ, পাহাড়ি ঢল এবং পাহাড় ধসের কারণে দক্ষিণ-পূর্ব ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সাত জেলা এখনও দুর্যোগের প্রভাব কাটিয়ে উঠতে পারেনি। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, এ পর্যন্ত এসব দুর্যোগে ৫৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সঙ্গে আগামী সপ্তাহের মাঝামাঝি সময়ে দেশের উত্তরাঞ্চলের কয়েকটি জেলায় নতুন করে স্বল্পমেয়াদি বন্যার আশঙ্কা প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র।
পূর্বাভাস অনুযায়ী, ১৯ থেকে ২৩ জুলাই সময়ের মধ্যে উজানে ভারী থেকে অতিভারী বৃষ্টিপাতের কারণে তিস্তা, ধরলা ও দুধকুমার নদীর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পেয়ে বিপৎসীমা অতিক্রম করতে পারে। এতে লালমনিরহাট, নীলফামারী, রংপুর, গাইবান্ধা ও কুড়িগ্রাম জেলার নিম্নাঞ্চলে স্বল্পমেয়াদি বন্যা দেখা দেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর, ভারতীয় আবহাওয়া বিভাগ এবং বৈশ্বিক আবহাওয়া সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, উত্তর-পশ্চিম বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট লঘুচাপটি সুস্পষ্ট লঘুচাপে পরিণত হয়েছে এবং এটি আরও উত্তর-পশ্চিম দিকে অগ্রসর হতে পারে। এর প্রভাবে রংপুর, রাজশাহী, সিলেট ও ময়মনসিংহ বিভাগসহ ভারতের আসাম, মেঘালয়, অরুণাচল প্রদেশ এবং হিমালয়-সংলগ্ন পশ্চিমবঙ্গে আগামী সাত দিনে ২৫০ থেকে ৩৫০ মিলিমিটার পর্যন্ত বৃষ্টিপাত হতে পারে।
বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, কুশিয়ারা নদীর পানি বৃদ্ধি পেলেও সুরমা নদীর পানি কিছুটা কমেছে। কুশিয়ারা নদী সিলেট ও মারকুলি পয়েন্টে বিপৎসীমার ওপরে প্রবাহিত হচ্ছে। অন্যদিকে ছাতকে সুরমা এবং শেরপুরে কুশিয়ারার পানি সতর্কসীমার কাছাকাছি রয়েছে। বর্তমানে সিলেট ও সুনামগঞ্জের বন্যা পরিস্থিতি স্থিতিশীল থাকলেও নতুন বৃষ্টিপাত পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটাতে পারে।
বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের নির্বাহী প্রকৌশলী সরদার উদয় রায়হান জানান, আগামী সপ্তাহের মাঝামাঝি সময়ে উজানের অতিভারী বৃষ্টির কারণে উত্তরাঞ্চলের নদীগুলোর পানি দ্রুত বাড়বে। এজন্য সংশ্লিষ্ট জেলার প্রশাসন ও স্থানীয় বাসিন্দাদের আগাম প্রস্তুতি নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তর আরও জানিয়েছে, সুস্পষ্ট লঘুচাপের প্রভাবে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে দমকা হাওয়াসহ মাঝারি থেকে ভারী বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে। একই কারণে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, মোংলা ও পায়রা সমুদ্রবন্দরকে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্কসংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি, বান্দরবান, কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ—এই সাত জেলায় ১২ লাখ ১৬ হাজার ৮০৫ জন মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছে ৫২ হাজার ৪৯৩টি পরিবার।
সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি হয়েছে কক্সবাজারে, যেখানে পাহাড় ধস ও ঢলের পানিতে ৩২ জন নিহত হয়েছেন। এছাড়া চট্টগ্রামে ১৫ জন, বান্দরবানে ৭ জন, রাঙামাটিতে ৩ জন এবং মৌলভীবাজারে ১ জনের মৃত্যু হয়েছে।
বর্তমানে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় ৮৭টি আশ্রয়কেন্দ্র চালু রয়েছে, যেখানে ৮৪৯ জন আশ্রয় নিয়েছেন। দুর্গত মানুষের জন্য চাল, নগদ অর্থ, শুকনা খাবার, শিশুখাদ্য ও গো-খাদ্য বরাদ্দ দিয়েছে সরকার। পাশাপাশি স্থানীয় প্রশাসনকে উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম জোরদার করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
কসমিক ডেস্ক