২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর দলটির বহু শীর্ষ নেতা ও কর্মী নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগের মুখে দেশ ছাড়েন। দলীয় সূত্রের দাবি, তাদের একটি বড় অংশ বর্তমানে যুক্তরাজ্যে রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন করে অবস্থান করছেন।
আওয়ামী লীগ–সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, সাবেক মন্ত্রী, সাবেক হুইপ, সাবেক সংসদ সদস্য এবং কেন্দ্রীয় কমিটির নেতাসহ কয়েক শ নেতাকর্মী বর্তমানে যুক্তরাজ্যে রাজনৈতিক আশ্রয়প্রার্থী হিসেবে রয়েছেন। সংখ্যার দিক থেকে যুক্তরাজ্যেই আশ্রয়প্রার্থীর হার সবচেয়ে বেশি বলে দাবি করা হচ্ছে।
যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের সূত্র অনুযায়ী, দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও সাবেক মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী আব্দুর রহমান, সাংগঠনিক সম্পাদক ও সাবেক হুইপ আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপন, আইন সম্পাদক ও সাবেক গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম ইতোমধ্যে আশ্রয়ের আবেদন করেছেন। একই তালিকায় রয়েছেন সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক ও নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী এবং সাবেক পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী আবদুল ওয়াদুদ দারা।
এ ছাড়া সাবেক সংসদ সদস্যদের মধ্যে সুনামগঞ্জ-১ আসনের সাবেক এমপি অ্যাডভোকেট রণজিৎ সরকার ও হবিগঞ্জের সাবেক এমপি আবু জাহির যুক্তরাজ্যে অবস্থান করছেন বলে জানা গেছে। দলীয় সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, আরও কয়েকজন সাবেক এমপিও রাজনৈতিক আশ্রয়ের জন্য আবেদন করেছেন।
স্থানীয় পর্যায়ের নেতাদের মধ্যেও রয়েছেন একাধিক প্রভাবশালী ব্যক্তি। তাদের মধ্যে সুনামগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাবেক জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান নুরুল হুদা মুকুট, কুমিল্লা উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক রোশন আলী মাস্টার, সিলেট মহানগর আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক বিধান কুমার শাহ, সাংগঠনিক সম্পাদক সালেহ আহমদ সেলিম এবং প্রয়াত নেতা বদর উদ্দিন আহমদ কামরানের ছেলে ও মহানগর আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আরমান আহমদ শিপলুর নাম উল্লেখ করা হয়েছে।
দলীয় সূত্র আরও জানায়, কেন্দ্রীয় পর্যায়ের পাশাপাশি জেলা, মহানগর, উপজেলা ও ইউনিট পর্যায়ের বহু নেতা-কর্মী যুক্তরাজ্যে রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন করেছেন। যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগসহ বিভিন্ন সহযোগী ও অঙ্গসংগঠনের কয়েক শ নেতাকর্মীও ব্রিটিশ সরকারের কাছে আশ্রয়ের আবেদনপত্র জমা দিয়েছেন।
তবে আশ্রয় প্রক্রিয়া এখনো চূড়ান্ত হয়নি। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, আবেদনকারীদের মধ্যে অল্প কয়েকজন প্রাথমিক সুরক্ষা বা সাময়িক আশ্রয় পেয়েছেন। বাকিদের আবেদন যুক্তরাজ্যের আদালত ও অভিবাসন কর্তৃপক্ষ পৃথকভাবে যাচাই-বাছাই করছে।
এ বিষয়ে যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ সাজেদুর রহমান ফারুক বলেন, সরকার পতনের পর দেশে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের জন্য ব্যাপক অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। নিরাপত্তার ঝুঁকির কারণে অনেকেই দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন।
তার ভাষ্যমতে, সাবেক মন্ত্রী, সাবেক এমপি ও সাবেক মেয়র পর্যায়ের প্রায় ১৫ থেকে ২০ জন নেতা বর্তমানে যুক্তরাজ্যে রাজনৈতিক আশ্রয়ে রয়েছেন। এ ছাড়া কেন্দ্রীয় পর্যায়ের আরও ১০ থেকে ১৫ জন শীর্ষ নেতা এবং বিভিন্ন স্তরের কয়েক শ নেতাকর্মী সেখানে অবস্থান করছেন।
সাবেক প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী এবং সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি শফিকুর রহমান চৌধুরী জানান, যুক্তরাজ্যে অবস্থানরত আওয়ামী লীগ নেতাদের মধ্যে মাত্র দুই থেকে তিনজন আগে থেকেই ব্রিটিশ নাগরিক ছিলেন। তিনি বলেন, যারা নির্বাচনের সময় ব্রিটিশ নাগরিকত্ব ত্যাগ করেছিলেন, তারা বর্তমানে নাগরিক না হলেও রেসিডেন্ট হিসেবে সেখানে বসবাস করতে পারেন।
শফিকুর রহমান চৌধুরী বলেন, ‘৫ আগস্টের পর ব্রিটেনে অবস্থানরত নেতার সংখ্যা ছিল মাত্র তিনজন। বর্তমানে যাঁরা সেখানে আছেন, তাঁদের সবাই রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন করেছেন।’ তার মতে, ব্রিটেনে আশ্রয় নেওয়া আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীর সংখ্যা কয়েক শ হতে পারে।
তিনি আরও বলেন, ব্রিটিশ সরকার মানবিক দিক বিবেচনায় প্রতিটি আবেদন আলাদাভাবে পর্যালোচনা করে। বৈধভাবে অবস্থান নিশ্চিত করতে রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন ছাড়া অনেকের সামনে আর কোনো বিকল্প ছিল না।