তিস্তা নদীর ভয়াবহ ভাঙনে বছরের পর বছর ঘরবাড়ি, ফসলি জমি ও জীবিকার শেষ সম্বল হারিয়ে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার সীমান্তবর্তী মর্ণেয়া ইউনিয়নের নরশিং এবং লালমনিরহাট সদর উপজেলার হরিণচড়া এলাকার হাজারো মানুষ। দীর্ঘদিনের দাবি ও আবেদন-নিবেদনের পর চলতি বছর ওই এলাকায় নদীতীর সংরক্ষণের কাজ শুরু হয়। এতে নদীপাড়ের বাসিন্দাদের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার হলেও সেই স্বস্তি দীর্ঘস্থায়ী হয়নি।
কাজ শেষ হওয়ার মাত্র কয়েক মাসের মধ্যেই তিস্তার তীব্র স্রোতে নতুন নির্মিত তীর সংরক্ষণ বাঁধের বিভিন্ন অংশ নদীগর্ভে বিলীন হতে শুরু করেছে। ফলে আবারও ঘরবাড়ি হারানোর আশঙ্কায় দিন কাটছে প্রায় ১ হাজার ৫০০ পরিবারের। স্থানীয়দের অভিযোগ, কয়েক দিনের পানির ওঠানামা ও আকস্মিক বন্যার কারণে পরিস্থিতি দ্রুত অবনতির দিকে যাচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য অনুযায়ী, গত কয়েক দিন ধরে তিস্তার পানির স্তর দ্রুত বাড়া-কমার ফলে নদীতীরবর্তী এলাকায় ভয়াবহ ভাঙন দেখা দিয়েছে। রংপুরের গঙ্গাচড়ায় তিস্তা সেতু রক্ষাবাঁধ ও ডান তীররক্ষার জন্য নির্মিত গ্রোয়েনের পাশাপাশি এবার তালপট্টি এলাকায় নতুন করে নির্মিত তীর সংরক্ষণকাজও ভাঙনের মুখে পড়েছে।
এই ভাঙনের কারণে শুধু বসতভিটাই নয়, বিস্তীর্ণ ফসলি জমি, দুটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং গুরুত্বপূর্ণ একটি সড়কও নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় দ্রুত জিও ব্যাগ ও কংক্রিট ব্লক ফেলে জরুরি প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
শুক্রবার সকালে সরেজমিনে দেখা যায়, লালমনিরহাটের আদর্শপাড়া থেকে গঙ্গাচড়ার তালপট্টি হয়ে নরশিং পর্যন্ত প্রায় দুই কিলোমিটার এলাকায় নির্মিত তীর সংরক্ষণ বাঁধের একাধিক স্থানে ধস নেমেছে। গত রবিবার থেকে শুরু হওয়া ভাঙনে ইতোমধ্যে প্রায় একশ মিটার বাঁধ নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। প্রতিদিন নতুন নতুন স্থানে ধস সৃষ্টি হওয়ায় স্থানীয়দের উদ্বেগ আরও বাড়ছে।
এলাকাবাসীর ভাষায়, বহু বছর পর একটি স্থায়ী বাঁধ পাওয়ার স্বপ্নও ভেঙে যাচ্ছে চোখের সামনে। পশ্চিম হরিণচড়া এলাকার আব্দুল হাকিম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, বহু প্রতীক্ষার পর বাঁধ নির্মাণ হলেও কয়েক মাসের মধ্যেই তা নদীতে বিলীন হতে শুরু করেছে। নরশিং এলাকার মতলেব আলী জানান, বর্তমান ভাঙনের গতি অব্যাহত থাকলে বাঁধটি আর বেশিদিন টিকবে না এবং তিন গ্রামের মানুষ আবারও সর্বস্ব হারানোর ঝুঁকিতে পড়বেন।
হরিণচড়া গ্রামের গৃহবধূ সেলিনা বেগম বলেন, রাতে সন্তানদের নিয়ে ঘুমাতে ভয় লাগে। তার আশঙ্কা, যেকোনো সময় নদী আবার ঘরবাড়ি গ্রাস করতে পারে। একই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন তালপট্টি এলাকার নূর মোহাম্মদও। তিনি বলেন, বাঁধ নির্মাণের পর কিছুটা স্বস্তি ফিরলেও এখন সেই বাঁধই নদীতে বিলীন হতে শুরু করেছে।
এ বিষয়ে রংপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রবিউল ইসলাম জানান, সংশ্লিষ্ট এলাকায় তীর সংরক্ষণের কাজ করা হলেও বরাদ্দ সীমিত থাকায় প্রয়োজনীয় পুরো অংশে কাজ করা সম্ভব হয়নি। সাম্প্রতিক ভাঙন রোধে জরুরি ভিত্তিতে প্রায় ৬ হাজার জিও ব্যাগ ফেলার কাজ চলছে।
তিনি আরও বলেন, পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। প্রয়োজন হলে আরও জিও ব্যাগ ও অন্যান্য প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। পাশাপাশি ভবিষ্যতে স্থায়ী সমাধানের লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় উদ্যোগও নেওয়া হবে।
স্থানীয়দের আশা, দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলে তিস্তার ভয়াবহ ভাঙন থেকে অন্তত বসতভিটা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, কৃষিজমি ও যোগাযোগব্যবস্থা রক্ষা করা সম্ভব হবে। অন্যথায় কয়েক মাস আগে যে বাঁধ নতুন স্বপ্ন দেখিয়েছিল, সেটিই অল্প সময়ের মধ্যে নদীর গর্ভে হারিয়ে যাবে।
কসমিক ডেস্ক