ভেনেজুয়েলায় সংঘটিত ভয়াবহ জোড়া ভূমিকম্পে প্রাণহানির সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৫৯৫ জনে। স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার অন্তর্বর্তীকালীন রাষ্ট্রপতি দেলসি রদ্রিগেজ এক সংবাদ সম্মেলনে সর্বশেষ এই তথ্য জানান। একই সঙ্গে তিনি বলেন, এখন উদ্ধার অভিযান মূলত জীবিতদের খোঁজার পরিবর্তে ধ্বংসস্তূপ থেকে মরদেহ উদ্ধারের ওপর বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২৪ জুনের ভূমিকম্পে দেশটির বহু অঞ্চল ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এখনো হাজার হাজার মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। তবে সরকার গণকবর তৈরির কোনো পরিকল্পনা করছে না বলে জানিয়েছে। রদ্রিগেজ জানান, দুর্যোগে ১৮৯টি ভবন সম্পূর্ণভাবে ধসে পড়েছে, বিশেষ করে উপকূলীয় লা গুয়াইরা অঞ্চল সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছে। এছাড়া ১১ হাজারেরও বেশি মানুষ আহত হয়েছেন।
ভূমিকম্প-পরবর্তী পুনর্গঠন কার্যক্রমে আন্তর্জাতিক সহায়তার বিষয়েও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট। তার ভাষ্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) এবং বিশ্বব্যাংক পুনরুদ্ধার কার্যক্রমে সহায়তা ও ঋণের প্রস্তাব দিয়েছে। তিনি জানান, আইএমএফের সঙ্গে ২০০ মিলিয়ন ডলারের একটি পুনর্গঠন তহবিল গঠনের কাজ চলছে।
রদ্রিগেজ আরও বলেন, সাবেক প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বিভাগের নিয়ন্ত্রণে থাকা ভেনেজুয়েলার তেল আয়ের অর্থ পুনর্গঠন এবং মানবিক সহায়তার কাজে ব্যয় করা হবে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রমে ৩০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি সহায়তা এবং প্রায় ৯০০ সামরিক সদস্য মোতায়েন করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স জন এম ব্যারেট জানান, এই অর্থ আশ্রয়কেন্দ্র, স্বাস্থ্যসেবা, স্যানিটেশন এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনসহ জরুরি খাতে ব্যয় করা হবে।
সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত লা গুইরা অঞ্চলে উদ্ধারকারীরা এখনও ধ্বংসস্তূপে তল্লাশি চালিয়ে যাচ্ছেন। আন্তর্জাতিক উদ্ধারকারী দলগুলোও নিখোঁজদের খুঁজে বের করার চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। তবে সময় যত গড়াচ্ছে, জীবিত কাউকে উদ্ধারের সম্ভাবনা ততই কমে আসছে।
এর মধ্যেই আশার এক খবর সামনে এসেছে। ৪৩ বছর বয়সী নিরাপত্তারক্ষী হার্নান আলবার্তো গিল ফ্লোরেসকে ভূমিকম্পের প্রায় আট দিন পর একটি ধসে পড়া শপিং মলের ধ্বংসস্তূপ থেকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। উদ্ধারকারীরা জানান, তিনি ধ্বংসস্তূপের ভেতরে বাতাস চলাচলের একটি ফাঁকা স্থানে আটকে ছিলেন এবং ফাটলের মাধ্যমে সরবরাহ করা খাবার ও পানি খেয়ে বেঁচে ছিলেন।
অন্যদিকে স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা সতর্ক করে বলেছেন, অতিরিক্ত ভিড়ের আশ্রয়কেন্দ্র এবং পর্যাপ্ত চিকিৎসার অভাবে সংক্রামক রোগ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। যদিও সরকারের উদ্ধার কার্যক্রম নিয়ে সমালোচনা হয়েছে, অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট দাবি করেছেন, ভূমিকম্পের পরপরই সরকার উদ্ধার অভিযান শুরু করেছিল। তবে তিনি স্বীকার করেন, অনেক এলাকায় প্রথম দিকে স্থানীয় বাসিন্দারাই উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনা করেছিলেন।
রাজনৈতিক পরিস্থিতিও এখন আলোচনায় রয়েছে। শুক্রবার অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট হিসেবে দেলসি রদ্রিগেজের ১৮০ দিনের মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা। ফলে দেশটির জাতীয় পরিষদ তার মেয়াদ বাড়ানো হবে নাকি নতুন নির্বাচনের ঘোষণা দেওয়া হবে, সে সিদ্ধান্ত নিতে পারে।
এদিকে নিহতদের মধ্যে সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র থেকে ফেরত পাঠানো (ডিপোর্ট) কয়েকজন ভেনেজুয়েলানও রয়েছেন। তাদের একজন ২৮ বছর বয়সী ড্যানিয়েল আলেহান্দ্রো নুনিয়েজ রামিরেজ। পরিবারের দাবি, দেশে ফেরার পর তাকে লা গুইরার একটি অস্থায়ী আবাসন হিসেবে ব্যবহৃত হোটেলে রাখা হয়েছিল। ভূমিকম্পে ভবনটি ধসে পড়লে সেখানে থাকা ১৪৬ জনের অধিকাংশই ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়েন।
ড্যানিয়েলের মা ওসওয়াদেলিজ নুনিয়েজ ছেলের অস্থি সংগ্রহ করার পর বলেন, ‘আমার ছেলে কোনো অপরাধী ছিল না। আমি চাই না এই মৃত্যুর বিচারহীনতা থাকুক।’ এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগ জানিয়েছে, ভেনেজুয়েলায় পৌঁছানোর পর ওই ব্যক্তিদের দায়িত্ব দেশটির সরকারের কাছেই হস্তান্তর করা হয়েছিল
কসমিক ডেস্ক