জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সম্মুখসারির যোদ্ধা শহীদ শরিফ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডের প্রধান সন্দেহভাজন ফয়সাল করিম মাসুদের ভিডিও বার্তা সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। ভিডিওতে ফয়সাল দাবি করেছেন, এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে তার কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই এবং তাকে পরিকল্পিতভাবে ফাঁসানো হয়েছে। তিনি জানান, নিজের নিরাপত্তার কারণেই তিনি দেশ ছেড়ে চলে গেছেন এবং বর্তমানে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ের শারজায় অবস্থান করছেন।
গত মঙ্গলবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এসব ভিডিও ঘিরে ব্যাপক ধূম্রজাল তৈরি হয়েছে। অনেকেই দাবি করছেন, ভিডিওগুলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে তৈরি। ভিডিওটি আসল না নকল—এই প্রশ্নে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে বলে জানিয়েছেন ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার শেখ মো. সাজ্জাত আলী।
গতকাল ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) মিলনায়তনে এ-ফোর বসুন্ধরা পেপার ক্র্যাব বেস্ট রিপোর্টিং অ্যাওয়ার্ড–২০২৫ অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ডিএমপি কমিশনার প্রথমে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। পরে তিনি বলেন, ভিডিওটি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হচ্ছে এবং যাচাই শেষ হলে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক বক্তব্য দেওয়া হবে।
এদিকে ভিডিওর প্রথম অংশ যাচাই করেছে ডিজিটাল অনুসন্ধানমূলক সংবাদমাধ্যম দ্য ডিসেন্ট। তাদের ফেসবুক পেজে প্রকাশিত পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, ভিডিওটি এআই দিয়ে তৈরি নয়। দ্য ডিসেন্টের দাবি, ফয়সালের মুখভঙ্গি ও চেহারা তার পূর্বের ভিডিও ও ছবির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। পাশাপাশি ভিডিওর ব্যাকগ্রাউন্ড নয়েজ বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, সেটিও এআই জেনারেটেড নয়। অন্তত চারটি নির্ভরযোগ্য এআই যাচাই টুলে পরীক্ষা চালিয়ে প্রতিটিই ভিডিওটিকে বাস্তব ভিডিও হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
তবে ভিডিওর কিছু ফ্রেমে ফয়সালের থুতনির দাড়ি হঠাৎ অদৃশ্য হয়ে যাওয়ার দৃশ্য নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। দ্য ডিসেন্টের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ভিডিও রেকর্ডের সময় ব্যবহৃত ফিল্টারের কারণে এমনটি হয়েছে। এই ফিল্টারগুলোও এআই প্রযুক্তিনির্ভর হলেও এতে পুরো ভিডিও এআই দিয়ে তৈরি—এমন প্রমাণ পাওয়া যায় না বলে তারা উল্লেখ করেছে।
ভিডিওতে ফয়সাল দাবি করেছেন, হাদিকে হত্যায় ব্যবহৃত মোটরসাইকেলে তিনি ছিলেন না। তবে দ্য ডিসেন্টের আগের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, ওই মোটরসাইকেলে ফয়সাল করিম ও তার সহযোগী আলমগীর শেখ ছিলেন। বাইকের পেছনে বসে গুলি চালান ফয়সাল এবং চালক ছিলেন আলমগীর শেখ—এ তথ্য পরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্তেও নিশ্চিত হয়েছে এবং দেশের শীর্ষ গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।
গত ১২ ডিসেম্বর ঢাকা-৮ আসন থেকে স্বতন্ত্র নির্বাচন করতে চাওয়া ওসমান হাদিকে পল্টনের কালভার্ট রোডে গুলি করা হয়। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে সিঙ্গাপুরে নেওয়া হলে ১৮ ডিসেম্বর তিনি মারা যান। এ ঘটনায় প্রথমে হত্যাচেষ্টার মামলা হলেও হাদির মৃত্যুর পর সেটি হত্যা মামলায় রূপ নেয়। মামলাটি বর্তমানে ডিএমপির ডিটেকটিভ ব্রাঞ্চ (ডিবি) মতিঝিল বিভাগ তদন্ত করছে।
এ ঘটনায় ফয়সালের বাবা, মা, স্ত্রী, শ্যালক, প্রেমিকাসহ তাকে পালাতে সহায়তাকারী মোট ১১ জনকে পুলিশ ও র্যাব গ্রেপ্তার করেছে। তবে ফয়সালের ভিডিও বার্তা বিষয়ে ডিবির কর্মকর্তারা মন্তব্য করতে রাজি হননি।
এদিকে ইনকিলাব মঞ্চের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার মুখপাত্র ফাতিমা তাসনিম জুমা দাবি করেছেন, হাদিকে হত্যার উদ্দেশ্যেই ফয়সালকে আগে জামিনে বের করা হয়েছিল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে তিনি জামিন প্রক্রিয়া ও এর পেছনের ভূমিকা নিয়ে একাধিক প্রশ্ন তুলেছেন।
হাদি হত্যাকাণ্ড ও ফয়সালের ভিডিও বার্তা—দুটোই এখন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। ভিডিওটির সত্যতা ও ফয়সালের অবস্থান নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত তদন্তের ফলাফলের ওপরই নির্ভর করছে।
কসমিক ডেস্ক