রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে হঠাৎ করে বোতলজাত সয়াবিন তেলের সরবরাহে সংকট দেখা দিয়েছে। অনেক দোকানে প্রয়োজনীয় পরিমাণ তেল পাওয়া যাচ্ছে না। একই সঙ্গে খোলা সয়াবিন ও পাম তেলের দামও বেড়েছে। ফলে ভোক্তাদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
রাজধানীর শেওড়াপাড়া এলাকার বাসিন্দা মিজানুর রহমান গতকাল সকালে এক বোতল সয়াবিন তেল কিনতে বের হয়ে প্রথমে মহল্লার কয়েকটি মুদিদোকানে খোঁজ করেন। কিন্তু কোথাও তেল না পেয়ে তিনি শেওড়াপাড়া বাজারে যান।
তিনি জানান, সেখানে চারটি দোকান ঘুরে শেষ পর্যন্ত ৫ লিটারের একটি জার কিনতে সক্ষম হন।
মিজানুর রহমান বলেন, “আমার প্রয়োজন ছিল ২ লিটারের এক বোতল। কিন্তু কোনো দোকানেই পাইনি। শেষে বাধ্য হয়ে ৫ লিটারের জার কিনতে হয়েছে। তাও কয়েকটি দোকান ঘোরার পর। হঠাৎ তেলের এমন সংকট কেন হলো, বুঝতে পারছি না।”
শুধু শেওড়াপাড়া নয়, রাজধানীর বিভিন্ন এলাকাতেই একই ধরনের পরিস্থিতি দেখা যাচ্ছে। খুচরা বাজারে বোতলজাত সয়াবিন তেলের সরবরাহ কমে গেছে। যদিও এখনো সরকার নির্ধারিত খুচরা মূল্য আনুষ্ঠানিকভাবে বাড়েনি।
তবে ডিলার বা সরবরাহকারী পর্যায়ে দাম কিছুটা বেড়েছে বলে জানিয়েছেন বিক্রেতারা। এতে খুচরা বিক্রেতাদের লাভের পরিমাণ কমে গেছে।
গতকাল সকালে রাজধানীর মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেট ঘুরে দেখা যায়, বেশির ভাগ মুদিদোকানে ৫ লিটারের বোতল পাওয়া গেলেও তা সীমিত পরিমাণে। আর ১ ও ২ লিটারের বোতল খুব কম দোকানে দেখা গেছে।
এ ছাড়া পুষ্টি, রূপচাঁদা, বসুন্ধরা ও ফ্রেশ ব্র্যান্ডের বাইরে অন্যান্য ব্র্যান্ডের তেল প্রায় অনুপস্থিত ছিল।
কৃষি মার্কেটের খোকন জেনারেল স্টোরের স্বত্বাধিকারী হুমায়ুন কবির বলেন, “তেলের অবস্থা খুব খারাপ। দুই–তিন দিন আগেও ডিলারের কাছ থেকে মোটামুটি তেল পাওয়া যেত। এখন বোতলের সয়াবিন তেল নেই বললেই চলে।”
তিনি জানান, স্বাভাবিক সময়ে প্রতিদিন ডিলারের কাছ থেকে তিনি ৮ থেকে ১০ কার্টন তেল আনতেন। কিন্তু গত কয়েক দিন ধরে মাত্র দুই থেকে তিন কার্টন তেল পাচ্ছেন। তাও আগের তুলনায় বেশি দামে কিনতে হচ্ছে।
শেওড়াপাড়া বাজারের বিক্রেতা আবদুল হাকিম বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার কারণে অনেক ক্রেতা মনে করছেন ভবিষ্যতে তেলের সংকট দেখা দিতে পারে। এ কারণে অনেকে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি তেল কিনছেন।
তিনি বলেন, “যার এক বোতল লাগত, তিনি দুই বোতল কিনছেন। সামনে আবার ঈদের বাজারও রয়েছে। সব মিলিয়ে সরবরাহের ওপর চাপ তৈরি হয়েছে।”
কারওয়ান বাজারে কয়েকটি তেল ব্র্যান্ডের ডিলারের দোকানেও একই চিত্র দেখা গেছে। সেখানে বিভিন্ন এলাকার খুচরা বিক্রেতারা তেল কিনতে ভিড় করছেন। তবে অধিকাংশই প্রয়োজনমতো তেল পাচ্ছেন না।
মগবাজার এলাকার এক বিক্রেতা মো. পলাশ বলেন, “আমার ৫ ও ২ লিটারের চার কার্টন করে তেল লাগত। কিন্তু ডিলার আমাকে মাত্র এক কার্টন করে তেল দিয়েছে। বলেছে, পরে আবার দেবে।”
ডিলার পর্যায়ে দাম কিছুটা বেড়ে যাওয়ায় খুচরা বিক্রেতাদের লাভও কমে গেছে। আগে ৫ লিটারের বোতল ৯৩০ টাকায় কিনে ৯৪০ টাকায় বিক্রি করলে প্রায় ১০ টাকা লাভ থাকত। এখন সেই বোতল কিনতে হচ্ছে প্রায় ৯৫০ টাকায়, ফলে লাভ কমে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫ টাকায়।
এদিকে বোতলজাত তেলের সংকটের মধ্যে খোলা সয়াবিন ও পাম তেলের দামও বেড়েছে। কারওয়ান বাজারে গতকাল প্রতি কেজি খোলা সয়াবিন তেল বিক্রি হয়েছে ১৯৮ থেকে ২০০ টাকায়, যা চার দিন আগে ছিল ১৯৩ থেকে ১৯৫ টাকা।
অন্যদিকে খোলা পাম তেলের দামও কেজিতে পাঁচ টাকা বেড়ে ১৭০ টাকায় উঠেছে।
তবে ভোজ্যতেল উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো বাজারে তেলের সংকটের অভিযোগ অস্বীকার করেছে। তাদের দাবি, উৎপাদন ও সরবরাহ স্বাভাবিক রয়েছে।
মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের একজন কর্মকর্তা জানান, তাদের মিলগেট থেকে তেলের সরবরাহ কমেনি এবং উৎপাদনও স্বাভাবিক রয়েছে। খুচরা বাজারে সংকটের কারণ সম্পর্কে তিনি নিশ্চিত করে কিছু বলতে পারেননি।
এদিকে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ফারুক আহম্মেদ বলেন, বাজারে সরবরাহ সংকটের বিষয়টি তারা খতিয়ে দেখবেন।
বিশ্লেষকদের মতে, সরবরাহে সামান্য ঘাটতি এবং ক্রেতাদের অতিরিক্ত কেনাকাটার কারণে বাজারে সাময়িক সংকট তৈরি হতে পারে। তবে দ্রুত সরবরাহ স্বাভাবিক হলে পরিস্থিতি আবার স্বাভাবিক হয়ে আসবে।
কসমিক ডেস্ক