বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সাম্প্রতিক সময়ের বাণিজ্যিক অস্থিরতার প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়েছে দেশের প্রধান স্থলবন্দর বেনাপোলে। শুল্কায়ন প্রক্রিয়ায় জটিলতা, সীমান্তে পণ্য খালাসে দীর্ঘসূত্রতা এবং দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের টানাপড়েনের কারণে আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রমে স্থবিরতা তৈরি হয়েছে। এর ফল হিসেবে বেনাপোল কাস্টম হাউসে রাজস্ব আদায়ে বড় ধরনের ঘাটতি দেখা দিয়েছে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ও কাস্টমস সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বেনাপোল কাস্টম হাউসের জন্য মোট রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয় ৯ হাজার ৩৪৪ কোটি টাকা। এর মধ্যে অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪ হাজার ১৩৩ কোটি টাকা। কিন্তু এই সময়ে আদায় হয়েছে মাত্র ৩ হাজার ১২০ কোটি টাকা। ফলে প্রথমার্ধেই রাজস্ব ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে এক হাজার ১৩ কোটি টাকা।
কাস্টমস কর্মকর্তাদের ভাষ্য, সরকার পরিবর্তনের পর ভারত-বাংলাদেশ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে যে টানাপড়েন তৈরি হয়েছে, তার সরাসরি প্রভাব পড়েছে আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে। এর কারণে বেনাপোল বন্দরে পণ্যবাহী ট্রাকের সংখ্যাও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।
তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরের শুরুতে প্রতিদিন গড়ে ৪৫০ থেকে ৫০০টি ট্রাক বেনাপোলে প্রবেশ করত। তবে অর্থবছরের শেষ দিকে তা কমে ৩৫০ থেকে ৪০০ ট্রাকে নেমে আসে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রতিদিন গড়ে মাত্র ৩০০ থেকে ৩৫০টি ট্রাক প্রবেশ করছে, যা বন্দরের কার্যক্রমে বড় ধরনের ধসের ইঙ্গিত দেয়।
আমদানি পরিসংখ্যানেও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। বেনাপোল স্থলবন্দর সূত্র জানায়, ২০২৫ সালে এ বন্দর দিয়ে মোট ১৮ লাখ ৬৩ হাজার ৪২০ দশমিক ২৩১ মেট্রিক টন পণ্য আমদানি হয়েছে। এর মধ্যে বছরের প্রথম ছয় মাসে আমদানি হয় ১০ লাখ ১৫ হাজার ৫১২ দশমিক ৯২ মেট্রিক টন। তবে শেষ ছয় মাসে আমদানি কমে দাঁড়ায় ৮ লাখ ৪৭ হাজার ৯০৭ দশমিক ৩১১ মেট্রিক টনে। অর্থাৎ বছরের দ্বিতীয়ার্ধে আমদানি কমেছে প্রায় ১ লাখ ৬৭ হাজার ৬০৯ মেট্রিক টন।
২০২৪ সালের সঙ্গে তুলনা করলে চিত্র আরও স্পষ্ট হয়। ওই বছর বেনাপোল দিয়ে মোট ২০ লাখ ৪২ হাজার ৫২ মেট্রিক টন পণ্য আমদানি হয়েছিল। সে হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে আমদানি কমেছে ১ লাখ ৭৮ হাজার ৬৩২ মেট্রিক টন।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, উচ্চ শুল্কযোগ্য পণ্য—যেমন শিল্পের কাঁচামাল, ইলেকট্রনিকস পণ্য, যন্ত্রাংশ ও কেমিক্যাল আমদানি কমে যাওয়ায় রাজস্ব আদায়ে সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে। কাস্টমস শুল্ক, ভ্যাট ও অন্যান্য কর আদায়ে এই কারণে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়েছে।
তবে আমদানিকারক ও সিঅ্যান্ডএফ ব্যবসায়ীরা বলছেন, শুধু আন্তর্জাতিক সম্পর্ক নয়, বন্দর ও কাস্টমসের অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনার জটিলতাও আমদানি কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ। বেনাপোল সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি মফিজুর রহমান স্বজন জানান, শুল্কায়ন প্রক্রিয়ায় অপ্রয়োজনীয় জটিলতা ও পণ্য খালাসে দেরির কারণে অনেক আমদানিকারক বেনাপোল এড়িয়ে বিকল্প বন্দর ব্যবহারের দিকে ঝুঁকছেন।
আরেক সিঅ্যান্ডএফ ব্যবসায়ী হাবিবুর রহমান হবি বলেন, দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের প্রভাব থাকলেও বন্দরের অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনা সহজ না হলে বাণিজ্য স্বাভাবিক হবে না। অতিরিক্ত সময় ও খরচ আমদানিকারকদের নিরুৎসাহিত করছে।
বেনাপোল কাস্টম হাউসের সহকারী কমিশনার মো. রাহাত হোসেন জানান, আমদানি বাণিজ্য কমে যাওয়ায় রাজস্ব আদায়ে চাপ সৃষ্টি হয়েছে। তবে শুল্কায়ন প্রক্রিয়া সহজ করা ও দ্রুত পণ্য খালাস নিশ্চিত করতে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ কাজ করছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে রাজস্ব আদায়ও ধীরে ধীরে বাড়বে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।