চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাসে এমন কিছু ঘটনা রয়েছে, যা সাধারণ মানুষের কাছে প্রায় অবিশ্বাস্য মনে হয়। তেমনই এক বিরল ও বিস্ময়কর ঘটনা ঘটে ২০১৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসে, যেখানে এক অনাগত শিশুকে গর্ভের ভেতরেই অস্ত্রোপচার করে বাঁচিয়ে রাখা হয় এবং পরে সে সুস্থভাবে জন্ম নেয়। এই শিশুকেই চিকিৎসা ইতিহাসে অনেকে “দুইবার জন্ম নেওয়া শিশু” হিসেবে উল্লেখ করে।
ঘটনার শুরু হয় যখন টেক্সাসের বাসিন্দা মার্গারেট হোকিন্স বয়েমার গর্ভধারণের ১৬তম সপ্তাহে নিয়মিত পরীক্ষার সময় জানতে পারেন তার অনাগত সন্তানের শরীরে একটি বিরল টিউমার রয়েছে। এই টিউমারের নাম স্যাক্রোকক্সিজিয়াল টেরাটোমা। এটি শিশুর মেরুদণ্ডের নিচের অংশে তৈরি হয় এবং দ্রুত বড় হয়ে হৃদযন্ত্র ও রক্ত সঞ্চালনের ওপর মারাত্মক চাপ সৃষ্টি করতে পারে। চিকিৎসকদের মতে, এই অবস্থায় শিশুর জীবন বাঁচানো অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে।
চিকিৎসকেরা পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে জানান যে, একমাত্র সম্ভাব্য সমাধান হতে পারে গর্ভকালীন অস্ত্রোপচার বা ফেটাল সার্জারি। তবে এই ধরনের অস্ত্রোপচার অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ, কারণ এতে মা ও শিশুর উভয়ের জীবনই বিপদের মুখে পড়তে পারে। তবুও সন্তানের জীবন বাঁচাতে সাহসী সিদ্ধান্ত নেন মা মার্গারেট।
গর্ভধারণের ২৩তম সপ্তাহে চিকিৎসকেরা একটি জটিল অপারেশন শুরু করেন। প্রথমে মায়ের জরায়ু সাবধানে খুলে শিশুটিকে আংশিকভাবে বাইরে আনা হয়। এরপর মাত্র প্রায় ২০ মিনিটের মধ্যে শিশুটির শরীর থেকে বড় টিউমারটি সফলভাবে অপসারণ করা হয়। পুরো প্রক্রিয়াটি ছিল অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও ঝুঁকিপূর্ণ, যেখানে প্রতিটি মুহূর্তই ছিল গুরুত্বপূর্ণ।
অস্ত্রোপচার শেষে চিকিৎসকেরা শিশুটিকে আবার মায়ের জরায়ুতে ফিরিয়ে দেন এবং জরায়ু সেলাই করে দেন। এরপর শিশুটি আবারও গর্ভের ভেতর স্বাভাবিকভাবে বেড়ে উঠতে থাকে। এই ধাপে চিকিৎসকদের লক্ষ্য ছিল শিশুটির গর্ভকালীন বৃদ্ধি যেন কোনোভাবে বাধাগ্রস্ত না হয় এবং তার জীবন ঝুঁকিমুক্ত থাকে।
প্রায় ১২ সপ্তাহ পর, ২০১৬ সালের জুন মাসে সিজারিয়ান অপারেশনের মাধ্যমে শিশুটির জন্ম হয়। জন্মের সময় সে ছিল সম্পূর্ণ সুস্থ এবং পরবর্তীতে স্বাভাবিকভাবেই বেড়ে ওঠে। এই ঘটনা চিকিৎসা জগতে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে এবং বিশ্বজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে আসে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরনের ফেটাল সার্জারি আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের এক অসাধারণ অগ্রগতি। এটি প্রমাণ করে যে, প্রযুক্তি ও চিকিৎসা দক্ষতার সমন্বয়ে এমনকি জন্মের আগেও জীবন রক্ষা করা সম্ভব। তবে একই সঙ্গে এটি অত্যন্ত সীমিত ও বিশেষ ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়, কারণ ঝুঁকি অনেক বেশি।
এই ঘটনাটি শুধু একটি চিকিৎসা সাফল্য নয়, বরং এক মায়ের অসীম সাহসিকতা এবং চিকিৎসকদের দক্ষতার সমন্বয়ের এক অনন্য উদাহরণ। আজও এই গল্পটি মেডিকেল শিক্ষার্থী ও গবেষকদের কাছে অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে আছে।
কসমিক ডেস্ক