দেশের সৃজনশীল অর্থনীতি খাতকে শক্তিশালী করে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং জিডিপিতে এর অবদান বাড়ানোর লক্ষ্যে একটি বড় পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে সরকার। প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে এই খাতকে কেন্দ্র করে দেশব্যাপী ‘ক্রিয়েটিভ হাব’ বা সৃজনশীল কেন্দ্র গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, সৃজনশীল অর্থনীতির অবদান জিডিপির ১ দশমিক ৫ শতাংশে উন্নীত করা এবং এ খাতের মাধ্যমে প্রায় ৫ লাখ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা হবে। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে সারা দেশে একাধিক ক্রিয়েটিভ হাব স্থাপন করা হবে, যা একই সঙ্গে সাংস্কৃতিক, বাণিজ্যিক ও উদ্যোক্তা উন্নয়নের কেন্দ্র হিসেবে কাজ করবে।
বাজেট বক্তৃতায় জানানো হয়, এই খাতে প্রাথমিকভাবে ৩০০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্পোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা (CSR) খাত থেকে আরও ৫০০ কোটি টাকা সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে।
এই উদ্যোগের পাশাপাশি সরকারের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিকল্পনা হলো ‘এক গ্রাম, এক পণ্য’ কর্মসূচি। এর মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের নিজস্ব ঐতিহ্যবাহী ও সৃজনশীল পণ্য চিহ্নিত করে সেগুলোর উৎপাদন, উন্নয়ন ও আন্তর্জাতিক বাজারে প্রসার ঘটানো হবে।
এই কর্মসূচির আওতায় থাকবে তাঁত ও বয়ন শিল্প, মৃৎশিল্প, পোড়ামাটির কারুকাজ, শীতল পাটি, শতরঞ্জি, কাঠের পুতুল, হাতে তৈরি গহনা এবং অন্যান্য আঞ্চলিক হস্তশিল্প। এসব পণ্যের মানোন্নয়ন এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় সক্ষমতা বাড়াতে একটি ‘ন্যাশনাল পুল অব ডিজাইনার্স’ গঠনের পরিকল্পনাও রয়েছে।
এছাড়া বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক) ডিজাইন সেন্টার আধুনিকায়নের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করা হবে বলে জানানো হয়েছে।
ক্রিয়েটিভ হাবগুলোকে শুধু সাংস্কৃতিক কেন্দ্র নয়, বরং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র হিসেবেও গড়ে তোলা হবে। এসব হাবে থাকবে সাংস্কৃতিক ভেন্যু, পাঠাগার, বইয়ের দোকান, সিনেপ্লেক্স, ক্যাফেটেরিয়া এবং আঞ্চলিক পণ্যের প্রদর্শনী ও বিপণনের ব্যবস্থা।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, একটি ১০ বছর মেয়াদি বিনিয়োগ কৌশল ও সময়াবদ্ধ কর্মপরিকল্পনা তৈরি করা হচ্ছে। এর অংশ হিসেবে পূর্বাচলে ১৬০ একর জমির ওপর একটি কেন্দ্রীয় বিশ্বমানের ক্রিয়েটিভ হাব স্থাপনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি কারওয়ান বাজার, তেজগাঁও এবং বিসিকের খালি শিল্প প্লটগুলোতেও এসব কেন্দ্র স্থাপনের সম্ভাব্যতা যাচাই চলছে।
রাজধানীর বাইরে বিভাগ, জেলা ও উপজেলা পর্যায়েও ক্রিয়েটিভ হাব সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে। এমনকি বাংলাদেশ শিশু একাডেমি ও শিল্পকলা একাডেমি প্রাঙ্গণেও অনুরূপ সুবিধা তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
শিক্ষা খাতেও এই উদ্যোগের প্রভাব পড়বে। প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ইতোমধ্যে ইনোভেশন হাব স্থাপন করা হয়েছে এবং ভবিষ্যতে অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ পর্যায়েও তা সম্প্রসারণের রোডম্যাপ তৈরি করা হচ্ছে।
সরকারের লক্ষ্য শুধু কর্মসংস্থান সৃষ্টি নয়, বরং একটি সৃজনশীল অর্থনৈতিক ইকোসিস্টেম গড়ে তোলা, যেখানে উদ্যোক্তা, শিল্পী ও উদ্ভাবকরা একসঙ্গে কাজ করতে পারবেন। অর্থমন্ত্রী জানিয়েছেন, এই উদ্যোগের মাধ্যমে অর্থনৈতিক সুযোগের গণতন্ত্রীকরণ করা হবে, যাতে সমাজের সব স্তরের মানুষ উন্নয়নের সুফল পেতে পারে।
সরকার আশা করছে, এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে দেশের সৃজনশীল অর্থনীতি জাতীয় উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। একই সঙ্গে ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে রূপান্তরের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য অর্জনে এটি সহায়ক হবে।
সব মিলিয়ে, সৃজনশীল অর্থনীতি, ক্রিয়েটিভ হাব এবং ‘এক গ্রাম, এক পণ্য’ উদ্যোগকে ঘিরে সরকারের এই নতুন পরিকল্পনা ভবিষ্যতের কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
কসমিক ডেস্ক