ফুটবল বিশ্বকাপ এলেই বাংলাদেশের ক্রীড়াপ্রেমীদের মধ্যে যে কয়েকটি দলকে ঘিরে সবচেয়ে বেশি আলোচনা ও উন্মাদনা দেখা যায়, তার অন্যতম আর্জেন্টিনা। কয়েক দশক ধরে দেশটির ফুটবল দল বাংলাদেশের কোটি সমর্থকের আবেগের অংশ হয়ে আছে। সেই ভালোবাসার সূচনা হয়েছিল মূলত কিংবদন্তি ফুটবলার ডিয়েগো ম্যারাডোনার হাত ধরে, যা সময়ের সঙ্গে আরও বিস্তৃত হয়েছে লিওনেল মেসির যুগে।
১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপে ম্যারাডোনার অসাধারণ নেতৃত্বে আর্জেন্টিনা বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়েছিল। এরপর ১৯৯০ সালের ইতালি বিশ্বকাপেও দলটি ফাইনালে পৌঁছায়। তবে শিরোপা ধরে রাখার স্বপ্ন পূরণ হয়নি। ফাইনালে পশ্চিম জার্মানির বিপক্ষে বিতর্কিত একটি পেনাল্টি থেকে গোল হজম করে পরাজয় বরণ করতে হয় আর্জেন্টিনাকে। ফলে টানা দুইবার বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন সেদিন অপূর্ণ থেকে যায়।
এরপর দীর্ঘ সময় অপেক্ষার পর ২০২২ সালে কাতার বিশ্বকাপে লিওনেল মেসির নেতৃত্বে আবারও বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয় আর্জেন্টিনা। সেই সাফল্যের পর এখন ফুটবল বিশ্বের অন্যতম বড় প্রশ্ন—শিরোপা কি ধরে রাখতে পারবে আলবিসেলেস্তারা?
বিশ্বকাপ চলাকালে মেসির বয়স ৩৯ বছরে পৌঁছাবে। অনেকের ধারণা, এটি হতে পারে তার ক্যারিয়ারের শেষ বিশ্বকাপ। ফলে এই আসরটি মেসির জন্য যেমন বিশেষ, তেমনি আর্জেন্টিনার জন্যও ঐতিহাসিক গুরুত্ব বহন করছে। কারণ, মেসির সামনে সুযোগ রয়েছে এমন একটি কীর্তি গড়ার, যা ম্যারাডোনা করতে পারেননি—টানা দুই বিশ্বকাপ জয়।
বিশ্বকাপের ইতিহাসে খুব কম দলই শিরোপা ধরে রাখতে পেরেছে। ইতালি ১৯৩৪ ও ১৯৩৮ সালে টানা দুইবার বিশ্বকাপ জিতে ইতিহাস গড়েছিল। পরে ব্রাজিল ১৯৫৮ ও ১৯৬২ সালে একই কৃতিত্ব দেখায়। সেই ব্রাজিল দলের অন্যতম তারকা ছিলেন ফুটবল সম্রাট পেলে। ফলে টানা দুই বিশ্বকাপ জয়ের কীর্তি ফুটবল ইতিহাসে অত্যন্ত বিরল একটি অর্জন হিসেবেই বিবেচিত হয়।
বর্তমান আর্জেন্টিনা দলকে ঘিরে আশাবাদের অন্যতম কারণ হলো তাদের ধারাবাহিকতা। কোচ লিওনেল স্কালোনির অধীনে দলটি শুধু বিশ্বকাপই জেতেনি, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দীর্ঘ সময় ধরে প্রতিযোগিতামূলক ফুটবলও উপহার দিয়েছে। তরুণ ও অভিজ্ঞ খেলোয়াড়দের সমন্বয়ে গড়া দলটি বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী স্কোয়াড হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
স্কালোনির জন্যও সামনে রয়েছে এক বিরল সুযোগ। যদি আর্জেন্টিনা আবারও বিশ্বকাপ জিততে পারে, তাহলে তিনি ইতিহাসের অন্যতম সফল কোচ হিসেবে নিজের নাম লিখিয়ে নিতে পারবেন। বিশ্বকাপের ইতিহাসে ইতালির ভিত্তোরিও পোজোই একমাত্র কোচ, যিনি টানা দুইবার বিশ্বকাপ জয়ের কৃতিত্ব অর্জন করেছেন। সেই রেকর্ডে ভাগ বসানোর সুযোগ এখন স্কালোনির সামনে।
তবে শিরোপা ধরে রাখার পথ মোটেও সহজ নয়। বিশ্বকাপের প্রতিটি আসরে নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ সামনে আসে। ইউরোপ ও দক্ষিণ আমেরিকার শক্তিশালী দলগুলোও নিজেদের সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নিয়ে মাঠে নামে। ফলে শুধুমাত্র অতীতের সাফল্য নয়, বর্তমান ফর্ম, দলের ভারসাম্য এবং চাপ সামলানোর সক্ষমতাও বড় ভূমিকা রাখবে।
ফুটবলপ্রেমীদের দৃষ্টি তাই এখন আর্জেন্টিনার দিকে। মেসির সম্ভাব্য শেষ বিশ্বকাপ, স্কালোনির কৌশল এবং শিরোপা ধরে রাখার স্বপ্ন—সব মিলিয়ে বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে আর্জেন্টিনা। শেষ পর্যন্ত তারা ইতিহাস গড়তে পারবে কি না, তার উত্তর মিলবে বিশ্বকাপের মাঠেই।
কসমিক ডেস্ক