গর্ভাবস্থা একজন নারীর জীবনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সময়। এই সময়ে মায়ের শারীরিক সুস্থতা যেমন প্রয়োজন, তেমনি অনাগত শিশুর সঠিক বৃদ্ধি ও বিকাশ নিশ্চিত করাও জরুরি। তাই খাবার নির্বাচনের ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করতে হয়। চিকিৎসকদের মতে, কিছু খাবার গর্ভাবস্থায় মা ও শিশুর জন্য ঝুঁকির কারণ হতে পারে।
সহায় হেলথ-এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ডা. তাসনিম জারা জানিয়েছেন, গর্ভাবস্থায় কিছু নির্দিষ্ট খাবার ও পানীয় এড়িয়ে চলা উচিত। কারণ এসব খাবারের মাধ্যমে বিভিন্ন সংক্রমণ, অপুষ্টি কিংবা জন্মগত জটিলতার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
তার পরামর্শ অনুযায়ী, রাস্তার ধারের খোলা পানীয়, ফুচকা, চটপটি, শরবত বা লাচ্ছির মতো খাবার এড়িয়ে চলা ভালো। এসব খাবারে ব্যবহৃত পানি বা উপকরণ বিশুদ্ধ না হলে টাইফয়েড, কলেরা কিংবা হেপাটাইটিস-ই এর মতো রোগ হতে পারে। এর ফলে ডায়রিয়া ও পানিশূন্যতার ঝুঁকি তৈরি হয়, যা মা ও শিশুর জন্য ক্ষতিকর।
গর্ভাবস্থায় অতিরিক্ত ভিটামিন এ-সমৃদ্ধ খাবার, বিশেষ করে গরু, খাসি বা মুরগির কলিজা অতিরিক্ত খাওয়াও ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। অতিরিক্ত ভিটামিন এ শিশুর জন্মগত ত্রুটির কারণ হতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন। তবে সীমিত পরিমাণে রান্না করা কলিজা খেলে সাধারণত সমস্যা হয় না।
এ ছাড়া কাঁচা পেঁপে গর্ভবতী নারীদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হয়। যদিও পাকা পেঁপে বা আনারস ক্ষতিকর—এমন বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই, তবুও কাঁচা পেঁপে এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
চা, কফি, কোমল পানীয় এবং এনার্জি ড্রিংকসে থাকা ক্যাফেইনও গর্ভাবস্থায় সীমিত বা সম্পূর্ণভাবে পরিহার করা উচিত। অতিরিক্ত ক্যাফেইন গ্রহণে শিশুর ওজন কম হওয়া বা গর্ভপাতের ঝুঁকি বাড়তে পারে। এমনকি কিছু ওষুধেও ক্যাফেইন থাকে, তাই ওষুধ সেবনের আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।
ডিম অত্যন্ত পুষ্টিকর খাবার হলেও গর্ভাবস্থায় আধাসিদ্ধ বা নরম কুসুমের ডিম খাওয়া উচিত নয়। কারণ এতে জীবাণু থেকে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। একইভাবে কাঁচা ডিম দিয়ে তৈরি মেয়োনিজ বা সালাদ ড্রেসিংও এড়িয়ে চলতে বলা হয়েছে।
ট্রান্সফ্যাটযুক্ত খাবার যেমন ডালডা বা বনস্পতি ঘি দিয়ে তৈরি বিস্কুট, কেক, চানাচুর, সিঙ্গারা কিংবা সমুচা অতিরিক্ত খাওয়া ভবিষ্যতে শিশুর স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়াতে পারে। এসব খাবার শিশুর হৃদরোগ ও স্থূলতার ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত বলে গবেষণায় দেখা গেছে।
অপাস্তুরিত দুধ এবং তা দিয়ে তৈরি নরম চিজেও ঝুঁকি রয়েছে। এসব খাবারে লিস্টেরিয়া নামক ক্ষতিকর জীবাণু থাকতে পারে, যা অকাল প্রসব বা মৃত সন্তান প্রসবের কারণ হতে পারে। তাই দুধ ভালোভাবে ফুটিয়ে অথবা পাস্তুরিত দুধ পান করার পরামর্শ দেওয়া হয়।
এ ছাড়া সসেজ, সালামি, হট ডগ বা পেপারনির মতো প্রসেসড মাংস এবং আধাসিদ্ধ মাংস খাওয়াও ঝুঁকিপূর্ণ। এসব খাবারে জীবাণু থেকে যাওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে। তাই ভালোভাবে রান্না না করে এসব খাবার খাওয়া উচিত নয়।
কাঁচা মাছ, সুশি, সাশিমি কিংবা স্মোকড ফিশেও লিস্টেরিয়া সংক্রমণের আশঙ্কা থাকে। ফলে গর্ভপাত বা অন্যান্য জটিলতা দেখা দিতে পারে। যারা সুশি পছন্দ করেন, তারা এ সময়ে ভেজিটেবল সুশি বেছে নিতে পারেন।
চিকিৎসকরা আরও বলেন, খাবারের পাশাপাশি ধূমপান ও অ্যালকোহল সম্পূর্ণভাবে বর্জন করতে হবে। ত্বকের যত্নে ব্যবহৃত কিছু প্রসাধনী বা সিরামেও ভিটামিন এ থাকতে পারে, যা শিশুর জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। তাই গর্ভাবস্থায় যেকোনো ওষুধ বা প্রসাধনী ব্যবহারের আগে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
সঠিক খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চললে গর্ভাবস্থা নিরাপদ ও সুস্থ রাখা সম্ভব। মা ও শিশুর সুস্থ ভবিষ্যতের জন্য সচেতনতা এবং সতর্কতাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
কসমিক ডেস্ক