মধ্যপ্রাচ্যে সাম্প্রতিক ইরান যুদ্ধের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়েছে পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর ওপর। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্যভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত। প্রায় ৪০ দিনের এই রক্তক্ষয়ী সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল-এর হামলার জবাবে ইরান পাল্টা আক্রমণ চালালে আমিরাতও তার প্রভাবের বাইরে থাকেনি।
এই পরিস্থিতিতে আমিরাতকে সামরিকভাবে সহায়তা করেছে ইসরায়েল। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে জানা গেছে, ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা প্রতিহত করতে ইসরায়েল অত্যাধুনিক প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি সরবরাহ করেছে আবুধাবিকে।
সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য সহায়তার মধ্যে রয়েছে ‘আয়রন বিম’ লেজার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। এই প্রযুক্তি স্বল্পপাল্লার রকেট ও ড্রোন ধ্বংস করতে সক্ষম। এটি আধুনিক যুদ্ধ প্রযুক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ, যা ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে প্রথম মোতায়েন করে ইসরায়েল। এই সিস্টেমের মাধ্যমে আকাশপথে আসা হুমকি দ্রুত শনাক্ত ও ধ্বংস করা সম্ভব।
এর পাশাপাশি আমিরাতকে দেওয়া হয়েছে উন্নত ‘স্পেকট্রো’ সার্ভেইল্যান্স সিস্টেম, যা প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরত্ব পর্যন্ত ড্রোন শনাক্ত করতে পারে। এই প্রযুক্তি যুদ্ধক্ষেত্রে আগাম সতর্কতা দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
এর আগেই মার্কিন সংবাদমাধ্যম জানিয়েছিল, ইসরায়েল তাদের বহুল আলোচিত ‘আয়রন ডোম’ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাও আমিরাতে পাঠিয়েছে। এই সিস্টেমটি দীর্ঘদিন ধরে রকেট ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার ক্ষেত্রে কার্যকর হিসেবে পরিচিত।
শুধু প্রযুক্তিগত সহায়তাই নয়, ইসরায়েল আমিরাতে প্রশিক্ষিত সেনা ও প্রতিরক্ষা ব্যাটারিও মোতায়েন করেছে বলে জানা গেছে। বেনইয়ামিন নেতানিয়াহু-এর নির্দেশে এসব ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। যুদ্ধের সময় আমিরাতকে নিয়মিত ‘রিয়েল-টাইম’ গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ করাও এই সহায়তার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল।
যুদ্ধের সময় ইরান আমিরাতকে বড় লক্ষ্যবস্তু হিসেবে চিহ্নিত করে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশটির ওপর প্রায় ৫৫০টি ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র এবং ২ হাজার ২০০টির বেশি ড্রোন হামলা চালানো হয়। যদিও অধিকাংশ হামলাই প্রতিহত করা সম্ভব হয়েছে, তবে ধ্বংসাবশেষের আঘাতে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
বিশেষ করে আবুধাবি ও দুবাইয়ের কিছু গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা যেমন বুর্জ আল আরব, পাম জুমেইরাহ এবং দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে বলে জানা গেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই সামরিক সহায়তা মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে একটি বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। ২০২০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় সম্পর্ক স্বাভাবিক হওয়ার পর থেকেই ইসরায়েল ও আমিরাতের মধ্যে কৌশলগত সম্পর্ক জোরদার হয়েছে। এই যুদ্ধে সেই সম্পর্ক আরও দৃঢ় হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
অন্যদিকে, ইরান দাবি করেছে যে আমিরাত সরাসরি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের পক্ষ নিয়ে কাজ করছে। যদিও আমিরাত সরকার এ বিষয়ে প্রকাশ্যে বিস্তারিত কিছু জানায়নি।
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় একটি অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকলেও এখনো স্থায়ী কূটনৈতিক সমাধান আসেনি। ফলে মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা পুরোপুরি কমেনি।
সব মিলিয়ে, ইরান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে আমিরাতকে ইসরায়েলের সামরিক সহায়তা শুধু একটি সাময়িক পদক্ষেপ নয়, বরং ভবিষ্যতের আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।