মার্কিন নৌ অবরোধ ও হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে চলমান উত্তেজনার কারণে ইরানের তেল খাত মারাত্মক চাপে পড়েছে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন বিশ্লেষণ সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, তেল মজুতের জায়গা দ্রুত পূর্ণ হয়ে আসায় দেশটি উৎপাদন কমানো বা সাময়িকভাবে বন্ধ করার ঝুঁকির মুখে রয়েছে।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, ১৩ এপ্রিল থেকে ইরানের গুরুত্বপূর্ণ বন্দর ও হরমুজ প্রণালিতে অবরোধ পরিস্থিতি শুরু হওয়ার পর থেকেই দেশটির তেল রপ্তানি কার্যত ব্যাহত হচ্ছে। ফলে উৎপাদিত তেল অভ্যন্তরীণভাবে সংরক্ষণ করতে হচ্ছে, যা দ্রুত মজুত সংকট তৈরি করছে।
উপাত্ত বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান কেপলার জানিয়েছে, বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে আগামী ১২ থেকে ২২ দিনের মধ্যেই ইরানের স্থলভাগের তেল মজুত সক্ষমতা প্রায় শেষ হয়ে যেতে পারে। একই ধরনের সতর্কবার্তা দিয়েছে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পর্যবেক্ষক সংস্থাগুলোও।
অন্যদিকে মার্কিন বাণিজ্যমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট দাবি করেছেন, ইরানের প্রধান রপ্তানি কেন্দ্র খারগ দ্বীপের তেল মজুত সক্ষমতা ইতোমধ্যে প্রায় পূর্ণ হওয়ার পথে। তিনি বলেন, অল্প কিছু দিনের মধ্যেই এই কেন্দ্র আর নতুন তেল ধারণ করতে পারবে না, যা ইরানের রপ্তানি ব্যবস্থাকে আরও সংকটে ফেলবে।
হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক জ্বালানি করিডোর। পারস্য উপসাগরকে উন্মুক্ত সাগরের সঙ্গে যুক্ত করা এই জলপথ দিয়ে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও তরল প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) পরিবাহিত হয়। এই পথেই এখন উত্তেজনা সবচেয়ে বেশি।
বর্তমানে ইরান অভিযোগ করছে, মার্কিন নৌবাহিনী তাদের তেলবাহী জাহাজগুলোর চলাচলে বাধা দিচ্ছে এবং কিছু ক্ষেত্রে জাহাজ ফিরিয়ে দিচ্ছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলছে, তারা আন্তর্জাতিক জলপথে নিরাপত্তা নিশ্চিত করছে।
আল জাজিরার তথ্য অনুযায়ী, ইরান তার মোট তেল রপ্তানির প্রায় ৯০ শতাংশ খারগ দ্বীপের মাধ্যমে সম্পন্ন করে থাকে। কিন্তু রপ্তানি ব্যাহত হওয়ায় উৎপাদিত তেল এখন মজুত করতে হচ্ছে, যা দ্রুত ট্যাংকার ও সংরক্ষণ ব্যবস্থার ওপর চাপ সৃষ্টি করছে।
কলোম্বিয়া সেন্টার অন গ্লোবাল এনার্জি পলিসির তথ্য বলছে, এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে খারগ দ্বীপের তেল ট্যাংকারগুলো প্রায় ৭৪ শতাংশ পূর্ণ হয়ে গেছে। সাধারণত নিরাপত্তা ও পরিচালনাগত কারণে ৮০ শতাংশের বেশি মজুত রাখা ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে ধরা হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, স্থলভাগ ও সমুদ্রভিত্তিক ভাসমান ট্যাংকার মিলিয়ে ইরান আরও প্রায় ২০ দিনের মতো উৎপাদিত তেল সংরক্ষণ করতে পারবে। এরপর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে না এলে উৎপাদন ধীরে ধীরে কমাতে বাধ্য হবে দেশটি।
তবে এই সংকট শুধু অর্থনৈতিক নয়, পরিবেশগত ও প্রযুক্তিগত ঝুঁকিও তৈরি করতে পারে বলে সতর্ক করেছেন বিশ্লেষকেরা। তাদের মতে, হঠাৎ করে উৎপাদন বন্ধ করলে ভূগর্ভস্থ তেলের স্তর ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, যা ভবিষ্যতে তেল উত্তোলনকে আরও ব্যয়বহুল ও জটিল করে তুলবে।
তবে কিছু বিশ্লেষক মনে করছেন, সমুদ্রে ভাসমান ট্যাংকারে থাকা মজুত কিছুটা হলেও ইরানকে স্বল্পমেয়াদে স্বস্তি দিতে পারে। ফলে তাৎক্ষণিকভাবে উৎপাদন বন্ধ না হলেও, চাপ ক্রমেই বাড়বে এবং দীর্ঘমেয়াদে ইরানের জ্বালানি খাতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে।
সব মিলিয়ে হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে চলমান উত্তেজনা শুধু ইরান নয়, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারেও অস্থিরতা তৈরি করছে। বিশ্ব অর্থনীতিতে এর প্রভাব কতটা গভীর হবে, তা এখন পরিস্থিতির অগ্রগতির ওপর নির্ভর করছে।
কসমিক ডেস্ক