তীব্র তাপপ্রবাহ ও জ্বালানি সংকট একসঙ্গে আঘাত হেনেছে পাবনার কৃষিখাতে। জেলার বিভিন্ন এলাকায় কৃষকদের এখন প্রধান সমস্যার নাম ডিজেল সংকট। ভোর থেকে তেলের পাম্পে লাইনে দাঁড়িয়েও প্রয়োজনীয় জ্বালানি না পাওয়ায় চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন তারা। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে সেচ কার্যক্রমে, যা কৃষি উৎপাদনকে হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জেলা সদরসহ বিভিন্ন উপজেলা শহরের তেল পাম্পগুলোতে ভোর থেকেই কৃষকদের দীর্ঘ সারি দেখা যাচ্ছে। পাত্র হাতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও অনেকে ডিজেল পাচ্ছেন না। যারা পাচ্ছেন, তাদের অনেকেই চাহিদার অর্ধেক বা তারও কম পাচ্ছেন। ফলে জমিতে প্রয়োজনমতো সেচ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
চর সদিরাজপুর এলাকার কৃষক রতন হোসেন জানান, গত কয়েকদিন ধরে তিনি শহরের বিভিন্ন পাম্পে ঘুরেও ডিজেল পাননি। দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে থাকার পরও শেষ মুহূর্তে তেল শেষ হয়ে যাওয়ার ঘোষণা শুনে তাকে খালি হাতে ফিরতে হয়েছে। তার মতে, ডিজেলের অভাবে শুধু কৃষিকাজ নয়, তার যানবাহন চালানোও বন্ধ হয়ে গেছে। তীব্র খরার মধ্যে জমিতে পানি দিতে না পারায় তিনি দুশ্চিন্তায় পড়েছেন।
একই ধরনের সংকটের কথা জানান ভাঁড়ারা গ্রামের কৃষক কামরুল হাসান। তার একাধিক শ্যালো ইঞ্জিন ও ট্রাক্টর রয়েছে, যা ডিজেল ছাড়া চালানো সম্ভব নয়। তিনি বলেন, ডিজেলের অভাবে ধান ও পাটের আবাদ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। জমিতে পানি দিতে না পারায় ফসলের অবস্থা খারাপ হয়ে যাচ্ছে এবং আবাদেও পিছিয়ে পড়ছেন তারা।
পাবনার সাঁথিয়া ও বেড়া উপজেলায় ১৯৯২ সালে কৃষি উৎপাদন বাড়ানোর লক্ষ্যে একটি সেচ প্রকল্প চালু করা হয়েছিল। পানি উন্নয়ন বোর্ডের উদ্যোগে খাল খননের মাধ্যমে এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়। তবে বর্তমানে অধিকাংশ খাল অকেজো হয়ে পড়ায় প্রকল্পের সুফল থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন কৃষকরা। নির্ভর করতে হচ্ছে ডিজেলচালিত শ্যালো ইঞ্জিনের ওপর, যা বর্তমান সংকটে আরও বড় সমস্যায় পরিণত হয়েছে।
সাঁথিয়া উপজেলার বাওইকোলা গ্রামের কৃষক হাসান আলী জানান, অতিরিক্ত খরচ জেনেও তিনি শ্যালো ইঞ্জিনের মাধ্যমে সেচ দিচ্ছেন। কিন্তু এখন ডিজেল না পাওয়ায় তিনি চরম বিপাকে পড়েছেন। যেখানে প্রতিদিন ১০ থেকে ১৫ লিটার ডিজেল প্রয়োজন, সেখানে সর্বোচ্চ পাঁচ লিটার পাওয়া যাচ্ছে। এতে শুধু ধান নয়, তিল, পাট, সবজি ও অন্যান্য ফসলও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
বেড়া উপজেলার চাকলা গ্রামের কৃষক টিপু মোলা বলেন, ধানের ফুল আসার সময় ঠিকমতো পানি না পেলে ফলন মারাত্মকভাবে কমে যাবে। তিনি জানান, একদিন তেল পাওয়া গেলেও পরবর্তী কয়েকদিন তা পাওয়া যায় না। ফলে ফসল শুকিয়ে যাচ্ছে এবং ক্ষতির আশঙ্কা বাড়ছে।
এ সমস্যা শুধু নির্দিষ্ট কয়েকটি উপজেলায় সীমাবদ্ধ নয়, বরং পুরো জেলাজুড়েই একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। ডিজেলের অভাবে কৃষিযন্ত্র চালানো যাচ্ছে না, অন্যদিকে বিদ্যুৎচালিত পাম্পগুলোও নিয়মিত চালানো সম্ভব হচ্ছে না। ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের কারণে সেচ কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এতে কৃষকদের মধ্যে উৎপাদন নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
এ বিষয়ে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. জাহাঙ্গীর আলম প্রামাণিক জানান, কিছুটা কষ্ট হলেও কৃষকরা তেল পাচ্ছেন এবং তাদের অগ্রাধিকার দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, শিগগিরই ধান কাটার মৌসুম শুরু হওয়ায় সেচের চাপ কিছুটা কমবে এবং উৎপাদনে বড় ধরনের প্রভাব পড়বে না।
অন্যদিকে জেলা প্রশাসক আমিনুল ইসলাম বলেন, অনেক ক্ষেত্রে অপ্রয়োজনীয়ভাবে কিছু ব্যক্তি কৃষক সেজে তেল নেওয়ায় সংকট আরও বাড়ছে। এ পরিস্থিতি মোকাবেলায় প্রশাসন ও প্রকৃত কৃষকদের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সব মিলিয়ে, ডিজেল সংকট ও তাপপ্রবাহের কারণে পাবনার কৃষকরা এক কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন। দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়া হলে এর প্রভাব কৃষি উৎপাদনে বড় ধরনের সংকট তৈরি করতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
কসমিক ডেস্ক