বিশ্বজুড়ে দ্রুত বাড়তে থাকা আবাসন সংকট এবং দক্ষ নির্মাণ শ্রমিকের অভাব নতুন করে ভাবাচ্ছে নির্মাণ খাতকে। এই পরিস্থিতিতে একটি প্রযুক্তিনির্ভর সমাধান নিয়ে এসেছে যুক্তরাজ্যের প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ‘অটোমেটেড আর্কিটেকচার’ (এইউএআর)। প্রতিষ্ঠানটি এমন একটি বহনযোগ্য ‘মাইক্রো-ফ্যাক্টরি’ তৈরি করেছে, যা ব্যবহার করে মাত্র এক দিনের মধ্যেই একটি বাড়ির কাঠের কাঠামো প্রস্তুত করা সম্ভব।
প্রচলিত নির্মাণ পদ্ধতিতে একটি বাড়ির কাঠামো তৈরি করতে যেখানে কয়েক সপ্তাহ সময় লাগে, সেখানে এই নতুন রোবোটিক প্রযুক্তির মাধ্যমে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই প্রয়োজনীয় কাঠের প্যানেল প্রস্তুত করা যায়। ফলে নির্মাণ প্রক্রিয়া অনেক দ্রুত সম্পন্ন করা সম্ভব হচ্ছে।
বর্তমানে যুক্তরাজ্যসহ বিশ্বের অনেক উন্নত দেশে নির্মাণ খাতে দক্ষ শ্রমিকের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৮ সালের মধ্যে শুধু যুক্তরাজ্যেই নির্মাণ লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে অতিরিক্ত প্রায় আড়াই লাখ কর্মীর প্রয়োজন হবে। এই ঘাটতি পূরণের লক্ষ্যেই অটোমেটেড আর্কিটেকচার তাদের স্বয়ংক্রিয় রোবোটিক প্রযুক্তি ব্যবহার করছে।
প্রতিষ্ঠানটির সহ-প্রতিষ্ঠাতা মলি ক্লেপুল জানিয়েছেন, এই প্রযুক্তির মূল উদ্দেশ্য মানুষের কাজ কেড়ে নেওয়া নয়। বরং নির্মাণ খাতে যে শ্রমিক সংকট তৈরি হয়েছে, সেটি মোকাবিলায় সহায়ক ভূমিকা রাখাই এর লক্ষ্য।
এই প্রযুক্তির সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো এর বহনযোগ্যতা। পুরো কারখানাটি একটি শিপিং কন্টেইনারের ভেতরে স্থাপন করা যায়। ফলে প্রয়োজন অনুযায়ী সহজেই এটি যেকোনো নির্মাণস্থলে পাঠানো সম্ভব। এতে করে আলাদা বড় কারখানা স্থাপনের প্রয়োজন পড়ে না এবং নির্মাণ কাজের সময়ও কমে যায়।
কাজের প্রক্রিয়াটিও অত্যন্ত আধুনিক। স্থপতিরা যখন কোনো ভবনের নকশা পাঠান, তখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সেই নকশা বিশ্লেষণ করে নির্ধারণ করে দেয় ঠিক কতটুকু কাঠ প্রয়োজন হবে। এর ফলে নির্মাণ উপকরণের অপচয় কমে এবং কাজ আরও দক্ষতার সঙ্গে সম্পন্ন করা যায়।
কন্টেইনারের ভেতরে থাকা রোবোটিক হাত কাঠকে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে কেটে প্রয়োজনীয় প্যানেল তৈরি করে। একই সঙ্গে জানালা ও দরজার জন্য নির্দিষ্ট জায়গা রেখে দেওয়া হয়। পাশাপাশি বিদ্যুৎ সংযোগের তার ও পাইপলাইনের জন্য প্রয়োজনীয় ছিদ্রও তৈরি করে দেয় রোবট।
এই প্যানেলগুলো পরে দক্ষ ঠিকাদাররা খুব দ্রুত জোড়া লাগিয়ে একটি সম্পূর্ণ বাড়ির কাঠামো দাঁড় করাতে পারেন। ফলে পুরো নির্মাণ প্রক্রিয়া অনেক বেশি দ্রুত এবং সংগঠিতভাবে সম্পন্ন করা সম্ভব হয়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রচলিত কাঠের ফ্রেম তৈরির তুলনায় এই পদ্ধতিতে প্রায় ৩০ শতাংশ পর্যন্ত খরচ সাশ্রয় করা সম্ভব। আবার বড় কারখানা থেকে প্যানেল কিনে এনে ব্যবহার করার চেয়েও এটি প্রায় ১৫ শতাংশ কম খরচে সম্পন্ন করা যায়।
পরিবেশগত দিক থেকেও এই প্রযুক্তির কিছু ইতিবাচক প্রভাব রয়েছে। তথ্য অনুযায়ী, এই পদ্ধতিতে তৈরি বাড়িগুলো ইটের তৈরি বাড়ির তুলনায় প্রায় ২০ শতাংশ কম গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গত করে। এছাড়া রোবটের তৈরি প্যানেলগুলো একে অপরের সঙ্গে খুব নিখুঁতভাবে যুক্ত হয়, ফলে ঘরের ভেতরের তাপ সহজে বাইরে বের হয়ে যেতে পারে না। এতে বাড়িগুলো আরও বেশি জ্বালানি সাশ্রয়ী হয়ে ওঠে।
যুক্তরাজ্য সরকার ২০২৯ সালের মধ্যে প্রায় ১৫ লাখ নতুন বাড়ি নির্মাণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। তবে এই লক্ষ্য অর্জনের পথে একটি বড় বাধা হিসেবে মানুষের পুরনো মানসিকতা কাজ করছে। অনেকেই এখনো মনে করেন কাঠের তৈরি বাড়ি ইটের বাড়ির মতো শক্ত বা টেকসই নয়।
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আধুনিক প্রযুক্তি ও উন্নত প্রক্রিয়াকরণের মাধ্যমে তৈরি কাঠের বাড়িগুলো যথেষ্ট মজবুত এবং দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। সঠিকভাবে নির্মাণ করা হলে এগুলো নিরাপত্তার দিক থেকেও নির্ভরযোগ্য।
অটোমেটেড আর্কিটেকচারের লক্ষ্য হলো ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বজুড়ে এক হাজার এমন মাইক্রো-ফ্যাক্টরি স্থাপন করা। প্রতিষ্ঠানটির পরিকল্পনা অনুযায়ী, এসব কারখানা থেকে প্রতি বছর অন্তত দুই লাখ বাড়ি তৈরি করা সম্ভব হবে।
বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটি যুক্তরাষ্ট্রের বাজারেও তাদের কার্যক্রম সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে। প্রযুক্তিনির্ভর এই নির্মাণ পদ্ধতি ভবিষ্যতে আবাসন খাতে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
কসমিক ডেস্ক