বিশ্বের অন্যতম কুখ্যাত মাদক সম্রাট নেমেসিও ওসেগুয়েরা কার্ভান্তেস ওরফে ‘এল মেনচো’ নিহত হওয়ার পর মেক্সিকোজুড়ে ব্যাপক সহিংসতা ছড়িয়ে পড়েছে। তবে এই মাদক সম্রাটকে শনাক্ত ও ধরার পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে তার এক প্রেমিকা—এমন তথ্য উঠে এসেছে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে।
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা জানায়, এল মেনচোর মৃত্যুর পর মেক্সিকোর ৩২টি রাজ্যের মধ্যে অন্তত ২০টি রাজ্যে সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় মেক্সিকোর ন্যাশনাল গার্ডের অন্তত ২৫ জন সদস্য নিহত হয়েছেন।
বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়, রোববার (২২ ফেব্রুয়ারি) মেক্সিকান বিশেষ বাহিনীর হাতে আটক হওয়ার কিছুক্ষণ পরই হেফাজতে থাকা অবস্থায় মারা যান এল মেনচো। তার মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়তেই দেশজুড়ে চরম অশান্তি ও বিশৃঙ্খলা শুরু হয়।
বছরের পর বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও মেক্সিকো যৌথভাবে এল মেনচোকে ধরার চেষ্টা চালিয়ে আসছিল। উভয় দেশেই সংগঠিত অপরাধ ও মাদক পাচারের অভিযোগে তার বিরুদ্ধে অসংখ্য গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি ছিল। মার্কিন সরকার তার মাথার দাম ঘোষণা করেছিল ১ কোটি ৫০ লাখ ডলার।
তবে শেষ পর্যন্ত এই মাদক সম্রাটের পতনের কারণ হয় তার ব্যক্তিগত সম্পর্ক। মেক্সিকোর প্রতিরক্ষামন্ত্রী জেনারেল রিচার্দো ত্রেভিলা জানান, এবার গোয়েন্দাদের দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টা সফল হয়েছে।
তিনি বলেন, গোয়েন্দারা এল মেনচোর ‘রোমান্টিক পার্টনারদের’ একজনের ঘনিষ্ঠ ও বিশ্বস্ত এক সহযোগীকে শনাক্ত করেন। ওই ব্যক্তি মেক্সিকান সামরিক বাহিনীর কাছে আগে থেকেই পরিচিত ছিলেন। তার ওপর নজরদারি শুরু করে নিরাপত্তা বাহিনী।
গত শুক্রবার ওই সহযোগী এল মেনচোর এক প্রেমিকাকে নিয়ে জালিস্কোর তাপালপা এলাকায় অবস্থিত একটি কমপ্লেক্সে যান। সেখানে ওই নারী এল মেনচোর সঙ্গে রাত কাটান। পরদিন প্রেমিকা এলাকা ত্যাগ করলে গোয়েন্দারা নিশ্চিত হন, এল মেনচো ওই কমপ্লেক্সেই অবস্থান করছেন এবং সেখানে বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
এরপরই মেক্সিকোর সেনাবাহিনী ও ন্যাশনাল গার্ড যৌথভাবে অভিযান শুরু করে। জালিস্কো ও পার্শ্ববর্তী রাজ্যগুলোতে ছয়টি হেলিকপ্টার ও অতিরিক্ত বিশেষ বাহিনী মোতায়েন করা হয়।
অভিযানের সময় এল মেনচো দুই দফায় দুইজন দেহরক্ষীকে সঙ্গে নিয়ে পালানোর চেষ্টা করেন। তবে শেষ পর্যন্ত তাকে আটক করতে সক্ষম হয় মেক্সিকান বাহিনী। অভিযানের সময় তিনি গুরুতর আহত হন। রাজধানীতে নেওয়ার পথে তার মৃত্যু হয়।
বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এল মেনচোর নেতৃত্বাধীন ‘জালিসকো নিউ জেনারেশন কার্টেল’ (সিজেজিএন) মেক্সিকোর অন্যতম ভয়ঙ্কর অপরাধী সংগঠন। তার মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়তেই কার্টেলটির সদস্যরা বিভিন্ন শহরে সহিংসতা শুরু করে।
এল মেনচোর অনুসারীরা রাস্তায় পেরেক ও কাঁটা ছড়িয়ে সড়ক অবরোধ করে। পাশাপাশি তারা বাস ও অন্যান্য যানবাহনে আগুন ধরিয়ে দেয়। অনেক শহরে ব্যাংক ও স্থানীয় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানেও অগ্নিসংযোগ করা হয়।
সহিংসতার কারণে বহু এলাকায় দোকানপাট বন্ধ হয়ে যায় এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার ব্যাপক সামরিক ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এল মেনচোর মৃত্যু মেক্সিকোর অপরাধী জগতে বড় ধরনের ক্ষমতার শূন্যতা তৈরি করেছে। এই শূন্যতা ঘিরে কার্টেলগুলোর মধ্যে আরও সহিংস সংঘর্ষের আশঙ্কা রয়েছে বলে মনে করছেন তারা।