অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান হিসেবে বিদেশ থেকে নিয়োগ পান আশিক চৌধুরী। উচ্চশিক্ষিত, সাবলীল উপস্থাপনা ও আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতার কারণে তাঁকে ঘিরে বিনিয়োগে নতুন গতি আসার প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল। তবে দেড় বছর পার হলেও বিনিয়োগ পরিস্থিতিতে বড় ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা যায়নি।
বিনিয়োগ পরিস্থিতি বিশ্লেষণে সাধারণত তিনটি সূচক গুরুত্ব পায়—বিডায় নিবন্ধিত বিনিয়োগ প্রস্তাব, বাংলাদেশ ব্যাংকের এফডিআই তথ্য এবং শিল্পের মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি। সর্বশেষ তথ্য বলছে, এই তিন ক্ষেত্রেই কাঙ্ক্ষিত গতি অনুপস্থিত। নতুন বিনিয়োগ কমেছে, মূলধনী যন্ত্র আমদানি হ্রাস পেয়েছে এবং বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ স্থবির অবস্থায় রয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪–২৫ অর্থবছরে নিট এফডিআই বেড়ে ১৬৯ কোটি ডলারে পৌঁছালেও এর বড় অংশ এসেছে বিদ্যমান বিদেশি কোম্পানির পুনর্বিনিয়োগ করা মুনাফা ও সহযোগী প্রতিষ্ঠান থেকে নেওয়া ঋণ থেকে। নতুন ইকুইটি বিনিয়োগ এসেছে মাত্র ৫৫ কোটি ডলার, যা গত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। অর্থাৎ নিট বিনিয়োগ বাড়লেও নতুন বিনিয়োগকারীর আগমন কমেছে।
বিডার নিবন্ধিত বিনিয়োগ প্রস্তাবের চিত্রও উদ্বেগজনক। ২০২৪–২৫ অর্থবছরে মোট বিনিয়োগ প্রস্তাব দাঁড়ায় প্রায় ৬৬ হাজার কোটি টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৫৮ শতাংশ কম। দেশি বিনিয়োগ প্রস্তাবেও বড় ধরনের পতন দেখা গেছে।
যদিও বিডার পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে, গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী অনেক দেশে যেখানে এফডিআই নেতিবাচক হয়, সেখানে বাংলাদেশে নিট বিনিয়োগ বেড়েছে। বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যানের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের প্রথম নয় মাসে এফডিআই উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে এবং বিদ্যুৎ, ব্যাংকিং ও স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ এসেছে।
তবে সামগ্রিক অর্থনৈতিক সূচকগুলো ভিন্ন চিত্র তুলে ধরে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, জিডিপির তুলনায় বেসরকারি বিনিয়োগের হার কমেছে। একই সময়ে মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি কমেছে প্রায় ১৯ শতাংশ এবং বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ ছয় মাস ধরে ৭ শতাংশের নিচে অবস্থান করছে।
দেশি বিনিয়োগকারীরা বলছেন, রাজনৈতিক সরকারের অনুপস্থিতি, আইন-শৃঙ্খলার দুর্বলতা, উচ্চ সুদহার এবং জ্বালানি সংকট বিনিয়োগের বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর মতে, স্থানীয় বিনিয়োগকারীরাই যখন নতুন বিনিয়োগে অনাগ্রহী, তখন বিদেশিদের কাছ থেকে বড় বিনিয়োগ আশা করা বাস্তবসম্মত নয়।
বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বাংলাদেশ যেখানে প্রায় দেড় বিলিয়ন ডলারের এফডিআই পেয়েছে, সেখানে ভারত, ইন্দোনেশিয়া ও ভিয়েতনাম বহু গুণ বেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে পেরেছে। এমনকি পাকিস্তানও সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশকে ছাড়িয়ে গেছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বিনিয়োগে গতি আনতে কেবল সম্মেলন ও প্রচারণা নয়, বরং ব্যাংক খাত সংস্কার, জ্বালানি নিরাপত্তা, ব্যবসা পরিচালনার খরচ কমানো এবং নীতিগত স্থিতিশীলতা জরুরি। নইলে বিনিয়োগ নিয়ে যত আলোচনা হবে, বাস্তবে তার প্রতিফলন ততটা দেখা যাবে না।
কসমিক ডেস্ক