মানুষের অর্থনৈতিক জীবনে ঋণের প্রয়োজন দীর্ঘদিনের। ব্যক্তিগত প্রয়োজন, ব্যবসা, কৃষিকাজ কিংবা জরুরি পরিস্থিতিতে ঋণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও ইসলামী অর্থনীতিতে ঋণের সঙ্গে সুদকে এক বিষয় হিসেবে দেখা হয় না। বরং প্রয়োজনের সময় সহযোগিতাকে উৎসাহিত করা হলেও সেই সহযোগিতার মাধ্যমে অন্যের দুর্বলতা থেকে নিশ্চিত মুনাফা অর্জনকে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে।
ইসলামী অর্থনৈতিক দর্শন অনুযায়ী, সুদ কেবল একটি আর্থিক হার নয়; এটি সম্পদের প্রবাহ, সামাজিক ভারসাম্য এবং অর্থনৈতিক ন্যায়বিচারের সঙ্গেও সম্পর্কিত। এ কারণে কোরআনে সুদকে শুধু আর্থিক বিধান হিসেবে নয়, বরং একটি ন্যায়ভিত্তিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার পরিপন্থী হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
কোরআনের সুরা আল-বাকারা (আয়াত ২৭৬)-এ বলা হয়েছে, “আল্লাহ সুদকে নিশ্চিহ্ন করেন এবং সদকাকে বৃদ্ধি দান করেন।” ইসলামী চিন্তাধারায় এই আয়াতের মাধ্যমে বোঝানো হয় যে, প্রকৃত সমৃদ্ধি কেবল সম্পদের পরিমাণে নয়; বরং সেই সম্পদের সামাজিক কল্যাণ ও ন্যায়সঙ্গত ব্যবহারের মধ্যেও নিহিত।
ইসলামী অর্থনীতিতে সুদের বিকল্প হিসেবে অংশীদারত্বভিত্তিক বিনিয়োগ, ব্যবসা, জাকাত, সদকা, করজে হাসানা এবং সম্পদের সুষম বণ্টনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এই ব্যবস্থার লক্ষ্য হলো অর্থনৈতিক কার্যক্রমে ঝুঁকি ও দায়িত্বের ন্যায্য বণ্টন নিশ্চিত করা।
সমসাময়িক ইসলামী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ওমর চাপরা তাঁর Islam and the Economic Challenge গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, একটি অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সফলতা শুধু জাতীয় আয় বা উৎপাদনের পরিমাণ দিয়ে নয়; বরং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা, মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণ এবং বৈষম্য কমানোর সক্ষমতার মাধ্যমেও মূল্যায়ন করা উচিত।
অন্যদিকে বিচারপতি মুহাম্মদ তাকি উসমানী তাঁর An Introduction to Islamic Finance গ্রন্থে বলেন, ইসলামে লাভের বৈধতা ঝুঁকি গ্রহণ ও দায়িত্ব বহনের সঙ্গে সম্পর্কিত। পূর্বনির্ধারিত ও নিশ্চিত মুনাফাভিত্তিক সুদ এবং অংশীদারত্বভিত্তিক বিনিয়োগের মধ্যে এটাই মৌলিক পার্থক্য।
কোরআনের সুরা আল-বাকারা (আয়াত ২৭৮-২৭৯)-এ সুদ পরিহারের নির্দেশ দিয়ে বলা হয়েছে, “তোমরা জুলুম করবে না এবং তোমাদের ওপরও জুলুম করা হবে না।” ইসলামী অর্থনৈতিক দর্শনে এই নীতিকে ন্যায়ভিত্তিক অর্থনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার অন্যতম ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
কসমিক ডেস্ক