বাংলাদেশে ডিজিটাল লেনদেন আরও সহজ, নিরাপদ ও আন্তঃপরিচালনযোগ্য (Interoperable) করতে বাংলা কিউআর (Bangla QR) ব্যবস্থার ব্যবহার দ্রুত সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। ক্ষুদ্র, মাঝারি ও বড় ব্যবসায়ীদের জন্য চালু হওয়া এই সেবার মাধ্যমে একটি মাত্র কিউআর কোড ব্যবহার করেই বিভিন্ন ব্যাংক, মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) এবং অনুমোদিত পেমেন্ট অ্যাপ থেকে অর্থ গ্রহণ করা সম্ভব হবে।
সংশ্লিষ্ট ব্যাংকে মার্চেন্ট অ্যাকাউন্ট খুলে আবেদন করলে সাধারণত কয়েক কার্যদিবসের মধ্যেই বাংলা কিউআর পাওয়া যায়। অনেক ক্ষেত্রে আবেদন সম্পন্ন হওয়ার সাত দিনের মধ্যেই ব্যবসায়ীরা তাদের দোকানে বাংলা কিউআর ব্যবহার শুরু করতে পারেন।
বাংলা কিউআরের জন্য আবেদন করবেন যেভাবে
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী, যেকোনো ক্ষুদ্র, মাঝারি কিংবা বড় ব্যবসায়ী বাংলা কিউআর সুবিধার জন্য আবেদন করতে পারবেন।
এজন্য প্রথমে আবেদনকারীর নামে যেকোনো তফসিলি বা বাণিজ্যিক ব্যাংকে একটি Savings, Current অথবা SND (Special Notice Deposit) অ্যাকাউন্ট থাকতে হবে।
এর পাশাপাশি একটি বৈধ ব্যবসা পরিচালনা করতে হবে। এরপর সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের নির্ধারিত Bangla QR Merchant Application Form পূরণ করে প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ ব্যাংকের শাখা ব্যবস্থাপক বা দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার কাছে জমা দিতে হবে।
আবেদন গ্রহণের পর ব্যাংক প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই সম্পন্ন করে সেটি তাদের কার্ড বা ডিজিটাল পেমেন্ট বিভাগে পাঠাবে। অনুমোদনের পর কিউআর কোড তৈরি হলে আবেদনকারীকে এসএমএস অথবা ই-মেইলের মাধ্যমে জানানো হবে।
পরে ব্যাংকের সিস্টেমে কিউআর সক্রিয় হলে ব্যবসায়ী শাখা থেকে সেটি সংগ্রহ করে নিজের দোকান বা প্রতিষ্ঠানে প্রদর্শন করতে পারবেন।
যেসব কাগজপত্র লাগবে
বাংলাদেশ ব্যাংক মাসিক লেনদেনের পরিমাণ অনুযায়ী ব্যবসায়ীদের দুইটি শ্রেণিতে ভাগ করেছে।
মাইক্রো মার্চেন্ট (মাসিক লেনদেন ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত):
- জাতীয় পরিচয়পত্র (NID)-এর ফটোকপি
- এক কপি পাসপোর্ট সাইজের রঙিন ছবি
রেগুলার মার্চেন্ট (মাসিক লেনদেন ১০ লাখ টাকার বেশি):
- জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি
- পাসপোর্ট সাইজের রঙিন ছবি
- ই-টিন (e-TIN) সনদ
- সর্বশেষ করবর্ষের ট্যাক্স রিটার্ন জমার প্রমাণপত্র
একটি কিউআরেই সব ধরনের পেমেন্ট
বাংলা কিউআরের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো এর Interoperability বা আন্তঃপরিচালনযোগ্য ব্যবস্থা।
অর্থাৎ, একজন ব্যবসায়ীকে বিকাশ, নগদ, রকেট, বিভিন্ন ব্যাংক বা অন্য কোনো ডিজিটাল পেমেন্ট সেবার জন্য আলাদা আলাদা কিউআর কোড ব্যবহার করতে হবে না। একটি বাংলা কিউআর স্ক্যান করেই বিভিন্ন ব্যাংক ও অনুমোদিত মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসের গ্রাহকরা অর্থ পরিশোধ করতে পারবেন।
এর ফলে লেনদেন দ্রুত সম্পন্ন হওয়ার পাশাপাশি ব্যবসায়ীদের হিসাব সংরক্ষণ এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনাও অনেক সহজ হবে।
ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য বড় সুবিধা
বর্তমানে চায়ের দোকান, মুদি দোকান, ফার্মেসি, রেস্তোরাঁ, পরিবহনসেবা এবং অন্যান্য ক্ষুদ্র ব্যবসায় বাংলা কিউআরের ব্যবহার দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে।
নগদ অর্থ হাতে না রেখে সরাসরি মার্চেন্ট অ্যাকাউন্টে টাকা জমা হওয়ায় চুরি, ছিনতাই বা নগদ হারানোর ঝুঁকি অনেকটাই কমে যায়।
এছাড়া প্রতিটি লেনদেনের ডিজিটাল রেকর্ড সংরক্ষিত থাকায় আয়-ব্যয়ের হিসাব রাখা সহজ হয়। ভবিষ্যতে এসব লেনদেনের তথ্য ব্যবসায়ীদের আর্থিক ইতিহাস (Financial Profile) তৈরি এবং ব্যাংক ঋণসহ বিভিন্ন আর্থিক সেবা পেতেও সহায়ক হতে পারে।
নিরাপদ লেনদেনে যা মনে রাখতে হবে
বাংলা কিউআর ব্যবহারের ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীদের কিছু সতর্কতা মেনে চলা জরুরি।
কোনো গ্রাহক অর্থ পরিশোধ করেছেন বলে দাবি করলেই পণ্য বা সেবা দেওয়া উচিত নয়। প্রথমে অবশ্যই নিজের মার্চেন্ট অ্যাকাউন্ট বা অ্যাপে অর্থ জমা হয়েছে কি না তা নিশ্চিত করতে হবে।
শুধু গ্রাহকের মোবাইলে দেখানো স্ক্রিনশট বা পেমেন্টের ছবি দেখে কখনো লেনদেন নিশ্চিত করা উচিত নয়।
এছাড়া ওটিপি (OTP), পিন নম্বর, পাসওয়ার্ড বা মার্চেন্ট অ্যাকাউন্টের কোনো গোপন তথ্য অন্য কারও সঙ্গে শেয়ার করা যাবে না। এসব নিরাপত্তা নির্দেশনা মেনে চললে বাংলা কিউআরের মাধ্যমে নিরাপদ, দ্রুত ও নির্ভরযোগ্য ডিজিটাল লেনদেন নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
কসমিক ডেস্ক