রাজধানীর গুলশানে অবস্থিত প্রধানমন্ত্রীর বর্তমান সরকারি বাসভবনকে ‘বিশেষ শ্রেণির’ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা (কেপিআই) হিসেবে ঘোষণা করেছে সরকার। নতুন এই সিদ্ধান্তের ফলে গুলশানের ১৯৬ নম্বর বাসভবন এবং এর আশপাশের এলাকা এখন সর্বোচ্চ নিরাপত্তা ব্যবস্থার আওতাভুক্ত হয়েছে। রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি, নথি ও প্রশাসনিক কার্যক্রমের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গত ৭ জুন কেপিআই-সংক্রান্ত কমিটির (কেপিআইডিসি) মাসিক সভায় গুলশানের ১৯৬ নম্বর বাসভবনকে বিশেষ শ্রেণির কেপিআই হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার সুপারিশ করা হয়। পরে সরকারের অনুমোদনের ভিত্তিতে ১৫ জুন এ-সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। সর্বশেষ গত শুক্রবার (৩ জুলাই) এ বিষয়ে সরকারি গেজেট প্রকাশিত হয়েছে।
বর্তমানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান রাজধানীর গুলশানের এই বাসভবন থেকেই সরকারি কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। যদিও রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনা সরকারি ব্যবহারের জন্য প্রস্তুত রয়েছে, তবুও তিনি সেখানে স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন না। ফলে তার বর্তমান বাসভবনের নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে সরকার এটি কেপিআই হিসেবে ঘোষণা করেছে।
বাসভবনটির মালিকানা নিয়েও রয়েছে বিশেষ ইতিহাস। জানা যায়, গত বছরের ৫ জুন অন্তর্বর্তী সরকার সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার হাতে এই বাড়ির নামজারির কাগজ হস্তান্তর করে। ১৯৮১ সালে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পর গুলশানে প্রায় দেড় বিঘা জমির ওপর নির্মিত এই বাড়িটি খালেদা জিয়ার নামে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তীতে নামজারি সম্পন্ন হওয়ার পর বাড়িটির সংস্কার ও আধুনিকায়ন করা হয়।
গত বছরের ২৫ ডিসেম্বর দেশে ফেরার পর তারেক রহমান এই বাসভবনে ওঠেন। এরপর ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণের পরও তিনি একই বাসভবন থেকে রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালন করে আসছেন।
নতুন নিরাপত্তা ব্যবস্থার আওতায় বাসভবনটির সার্বিক নিরাপত্তা তদারকির জন্য স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্স (এসএসএফ)-এর সমন্বয়ে পৃথক নিরাপত্তা কমিটি গঠন করা হবে। পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ২৪ ঘণ্টা দায়িত্ব পালন করবেন প্রেসিডেন্ট গার্ডস রেজিমেন্টের (পিজিআর) সদস্যরা। তাদের সঙ্গে বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত পুলিশ সদস্যরাও দায়িত্ব পালন করবেন।
সরকারের নিরাপত্তা নির্দেশনায় কেপিআই ঘোষিত স্থাপনার অবকাঠামোগত নিরাপত্তার বিষয়েও বিস্তারিত নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। নির্দেশনা অনুযায়ী, স্থাপনার সীমানাপ্রাচীরের উচ্চতা কমপক্ষে ১২ ফুট হতে হবে এবং এর ওপর অতিরিক্ত তিন ফুট উচ্চতার ‘ওয়াই’ আকৃতির কাঁটাতারের বেড়া স্থাপন করতে হবে।
এ ছাড়া নিরাপত্তা ঝুঁকি বিবেচনায় আশপাশের উঁচু ভবন থেকে নজরদারি, ছবি তোলা কিংবা সম্ভাব্য হামলার ঝুঁকি মূল্যায়ন করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কেপিআই ঘোষিত স্থাপনার ১৫০ থেকে ৩০০ মিটারের মধ্যে নতুন কোনো বহুতল ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ছাড়পত্র বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, স্থাপনার ২৫ মিটারের মধ্যে নতুন কোনো ভবন বা স্থাপনা নির্মাণ করা যাবে না। পাশাপাশি স্থাপনার চারপাশের পাঁচ ফুট এলাকার মধ্যে থাকা বিদ্যুৎ ও টেলিফোনের খুঁটি এবং নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করতে পারে—এমন গাছপালা অপসারণেরও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত ও পারিবারিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ নথি, সংবেদনশীল তথ্য এবং প্রশাসনিক কার্যক্রমের নিরাপত্তা জোরদার করাই এই সিদ্ধান্তের মূল উদ্দেশ্য। কেপিআই ঘোষণার ফলে সংশ্লিষ্ট এলাকায় নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা আরও কঠোর হবে এবং প্রয়োজনীয় নজরদারি ও নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমও বাড়ানো হবে।
সরকারের এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে রাজধানীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই স্থাপনাটি এখন দেশের বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থার আওতায় অন্তর্ভুক্ত হলো। ফলে ভবিষ্যতে নিরাপত্তা, অবকাঠামো এবং প্রবেশ নিয়ন্ত্রণসহ সব ধরনের ব্যবস্থা আরও কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা হবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
কসমিক ডেস্ক